অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিক্ষা দেয় কারবালা

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | রবিবার, ২৩ জুলাই ২০২৩ | পড়া হয়েছে 14 বার

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

একজন জ্ঞানগুরুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল -অজ্ঞতা কী? জবাবে জ্ঞানগুরু বললেন, তোমরা ভাব কোনো কিছু না জানা অজ্ঞতা। এটা ভুল ধারণা। অজ্ঞতা হলো কোনো কিছু অর্ধেক জানা।

শৈশবে অন্ধের হাতি দেখা নিয়ে একটি চমৎকার গল্প পড়েছিলাম। সাতজন অন্ধ হাতির সাতটি অংশ হাতড়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে তুমুল বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। যে হাতির কান ধরেছে সে বলে এটা একটা বড় কুলা। হাতির পিঠ ধরা অন্ধ বলল, তুমি ভুল বলছ এটা তো মস্ত বড় এক দেয়াল। হাতির লেজ আর শুঁড় ধরা ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিল।

আজকের দুনিয়ার মুসলমানদের অবস্থা অন্ধের হাতি দেখা গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। কেউ বলছে ইসলাম হলো মাজহাব অনুসরণের মধ্যে। আরেকজন বলছে মাজহাব ছেড়ে হাদিস মানাই আসল ইসলাম। অন্যজন বলছে যতই দ্বীন ধর্ম কর আমার দলের কর্মী না হলে রক্ষা নেই। এত দলাদলি ও মতের মাতামাতি দেখে বেশ উপহাসের সঙ্গেই লালন বলেছেন- এসব দেখি কানার হাটবাজার!

 

হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম এলে মুসলিম বিশ্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদল কারবালা ও ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতকে স্মরণ করে মিছিল-শোভাযাত্রা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদল কারবালার নির্মম ঘটনার সঙ্গে এজিদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং শোহাদায়ে কারবালার স্মরণকারীদের শিয়া বলে প্রচার-প্রচারণা করতে থাকে।

আসলে অন্ধের হাতি দেখার ঘটনা এখানেও ঘটেছে। আহলে বাইত, ইমাম হোসাইন ও কারবালা এ বিষয়গুলো নিয়ে শিয়াদের একটি অংশ বাড়াবাড়ি করে এটা যেমন সত্য, তাই বলে সুন্নিরা এ বিষয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে এটাও চরম অন্যায়। শিয়া-সুন্নি দুই মাজহাবেই একটি দল আছে যারা ভারসাম্যপূর্ণ পন্থায় শোহাদায়ে কারবালা, আহলে বাইত ও হজরত আলীর প্রচার-প্রচারণা করে থাকেন। শিয়াদের বাড়াবাড়ি বা সুন্নিদের মধ্যে কোনো কোনো গোষ্ঠীর কড়াকড়ির কারণে শরিয়তসম্মতভাবে কারবালার শিক্ষা অনুষ্ঠান থেকে মানুষকে নিষেধ করা জ্ঞানীর কাজ হতে পারে না।

একইভাবে যারা কারবালার ঘটনার পেছনে ইয়াজিদের কোনো হাত নেই বলে জোরেশোরে প্রচার করেন, জেনে হোক না জেনে হোক তারা স্পষ্ট ভুলের মধ্যে আছেন। সুন্নি ঐতিহাসিকদের অসংখ্য সূত্র থেকে প্রমাণিত কারবালায় ইমাম হোসাইনের হত্যার পেছনে এজিদের নির্দেশ ছিল। শুধু তাই নয়, ইমাম হোসাইনের কাটা মাথা যখন এজিদের সামনে রাখা হলো তখন এজিদ কী বলেছিল আল্লামা ইবনে কাসিরে মুখেই শুনে নিই আসুন।

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় ইবনে কাসির লেখেন- ‘যখন হোসাইন (রা.)-এর কাটা মাথা এজিদের সামনে আনা হলো তখন এজিদ হাতের লাঠি দিয়ে ইমামের মাথা মোবারক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছিলেন। একবার ডানে খোঁচা দেয়। আরেকবার বামে। এরপর ঠোঁটের কাছে লাঠি নিয়ে আসল। লাঠি দিয়ে ঠোঁট দুটি ফাঁক করল। সঙ্গে সঙ্গে ইমামের নূরানি দাঁতগুলো ঝলক দিয়ে উঠল।
পাপীষ্ঠ এজিদ ইমামের দাঁতে মুখে এমনভাবে খোঁচাতে লাগল যে, দরবারে উপস্থিত আহলে বাইত প্রেমিকরা সহ্য করতে পারলেন না। দরবারে থাকা আবু বোরজা (রা.) জীবনের মায়া ত্যাগ করে সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বললেন, রে বদখত এজিদ! তুই কোন ঠোঁটে আঘাত করছিস! আমি অসংখ্যবার দেখেছি এই ঠোঁটে আল্লাহর রসুল (সা.) চুমু খেতেন আর বলতেন, আমার আদরের কলিজার টুকরো নাতি! তোমরা দুজন বেহেশতি যুবকদের সরদার। তোমাদের যারা হত্যা করবে তাদের জন্য জাহান্নামের নিকৃষ্ট আবাস।’

ইতিহাসবিদ ইবনে আসাকেরের মতে, আবু বোরজা দৃপ্ত কণ্ঠে আরও বলেছেন, ‘নাপাক এজিদ! ভেবে দেখ, কেয়ামতের দিন তোর পাশে থাকবে পাপীষ্ঠ ইবনে জিয়াদ, আর হোসাইনের পাশে থাকবে তার নানা নবীয়ে কায়েনাত (সা.)। সেদিন তুই কীভাবে নবীজিকে মুখ দেখাবি।’

বলছিলাম কারবালা নিয়ে মুসলমানরা নতুন করে বিভেদের দেয়াল তোলার চেষ্টা করছে। বিভেদ তখনই হয় যখন পুরো দৃশ্যটা চোখের সামনে থাকে না। যারা হোসাইন হোসাইন বলে মুখে ফেনা তোলেন তাদের চরিত্রে-আচরণে কতটুকু হোসাইনের আদর্শ আছে এটা বড় প্রশ্ন।

ইমাম হোসাইনের আদর্শ হলো অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। মিথ্যার কাছে নত না হওয়া। অর্থের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি না করা। আজ যারা মহররম এলে হোসাইনের পক্ষে মিছিল করেন, তাজিয়া করেন, মর্সিয়া গান তারা কি হোসাইনের আদর্শ জীবনে ধারণ করতে পেরেছেন? যদি না পারেন তাহলে এসব তাজিয়া-মর্সিয়া লোক দেখানো অনুষ্ঠানিকতা করে আসলে তারা হোসাইনকেই কষ্ট দিচ্ছে।

আবার যারা শোহাদায়ে কারবালার স্মরণে শরিয়ত সমর্থিত অনুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল আলোচনার অনুষ্ঠান দেখলেই নাক সিটকাতে থাকেন তারা জ্ঞানের পুরো চিত্রটাকে সামনে রাখতে পারেননি। নবীর মৃত্যুর ৫০ বছর না যেতেই আহলে বাইতের ৭২ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার প্রেক্ষাপট বারবার আলোচনা হতেই হবে। এসব আলোচনা না হলে যুগে যুগে এজিদের মতো মদখোর-নারীখোর শাসক মুসলমানদের সামনে ছড়ি ঘোরাবে কিন্তু প্রতিবাদের জন্য হোসাইনের মতো মর্দে মুজাহিদরা জেগে উঠবে না।

তাইতো কারবালা নিয়ে যথার্থ মন্তব্যটি করেছেন আল্লামা ইকবাল-‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ। প্রতিটি কারবালার পরই ইসলাম নতুন করে জেগে ওঠে।’

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পীরসাহেব, আউলিয়ানগর

লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com