আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখলে প্রতিদান মেলে

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭ | পড়া হয়েছে 706 বার

যিনি আল্লাহকে বিশ্বাস করেন তিনি মুমিন। মুমিন বান্দাকে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা কর। যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও।’ (সূরা মায়েদাহ : ২৩)। অন্যত্র আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তুমি আল্লাহর ওপর ভরসা কর। তুমি তো স্পষ্ট সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা নমল : ৭৯)। ‘তাওয়াক্কুল’ তথা ‘আল্লাহর ওপর ভরসা’ মানব জীবনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্তর। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইমানের যেসব বিষয় ফরজ বা আবশ্যকীয়, তাওয়াক্কুল তার অন্যতম। তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞায় সুফি তাবেয়ি হাসান বসরি (র.) বলেন, ‘মালিকের ওপর বান্দার তাওয়াক্কুলের অর্থ, আল্লাহই তার নির্ভরতার একমাত্র স্থান— একথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।’ শায়েখ উছায়মিন (র.) বলেন, ‘কল্যাণ অর্জনে ও অকল্যাণ দূর করার জন্য সত্যিকারভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি আল্লাহতায়ালা যেসব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতে বলেছেন তা অবলম্বন করাকে তাওয়াক্কুল বলে’।

তাওয়াক্কুলের গুরুত্ব-তাত্পর্য সম্পর্কে তাবেয়ি সাঈদ ইবনু জুবায়ের (র.) বলেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা ইমানের সামষ্টিক রূপ’। ইবনে কায়্যিম (র.) বলেন, ‘বান্দা যদি কোনো পাহাড় সরাতে আদিষ্ট হয় আর যদি সে কাজে সে আল্লাহতায়ালার ওপর যথার্থভাবে ভরসা করতে পারে, তবে সে পাহাড়ও সরিয়ে দিতে পারবে।’ সুতরাং একজন মুমিন তার যাবতীয় কাজে আল্লাহর ওপর ভরসাকে শুধু একটি মুস্তাহাব বিষয় ভাবতে পারে না; বরং তাওয়াক্কুলকে একটি দ্বীনি দায়িত্ব বা আবশ্যিক কর্তব্য বলে মনে করবে। এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র.) বলেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা করা ফরজ। এটি উচ্চাঙ্গের ফরজগুলোর অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহর জন্য ইখলাস বা বিশুদ্ধ চিত্তে কাজ করা ফরজ।

অজু ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতার জন্য গোসলের ব্যাপারে যেখানে আল্লাহতায়ালা একটি আয়াতে একবার বলে তা ফরজ সাব্যস্ত করেছেন, সেখানে একাধিক আয়াতে তিনি তাঁর ওপর ভরসা করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁকে ছাড়া অন্যের ওপর ভরসা করতে নিষেধ করেছেন’।

আল্লাহর ওপর ভরসা করার মানে এই নয় যে, বান্দা তার চেষ্টা-তদবির বন্ধ করে দেবে এবং উপায়-উপকরণ ছেড়ে দেবে। বরং তাওয়াক্কুলের মানে হলো, অন্তর থেকে আল্লাহর ওপর ভরসা করা, একই সঙ্গে পার্থিব নানা উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা এবং পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহই রিজিকদাতা, তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, জীবন ও মৃত্যুদাতা তিনিই। তিনি ছাড়া যেমন কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই, তেমনি তিনি ছাড়া কোনো প্রতিপালকও নেই। আল্লামা ইবনে কায়্যিম (র.) বলেন, ‘তাওয়াক্কুলের রহস্য ও তাত্পর্য হলো, বান্দার অন্তর এক আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হওয়া; জাগতিক উপায়-উপকরণের প্রতি অন্তরের মোহশূন্য থাকা, তার প্রতি আকৃষ্ট না হওয়া। কারণ, এসব উপায়-উপকরণের সরাসরি ক্ষতি কিংবা উপকার করার কোনোই ক্ষমতা নেই’।

তাওয়াক্কুলের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পার, তবে আল্লাহ তোমাদের পাখির মতো রিজিক দেবেন। পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফিরে।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)। পাখি যেমন তাওয়াক্কুলের নামে হাত-পাত ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে না বরং খুব সকালেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে রিজিকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, তেমনি আমরাও যদি আল্লাহর ওপর ভরসা করে সম্ভাব্য সব উপায়-উপকরণ এবং চেষ্টা-তদবির করি, তবে আল্লাহতায়ালা আমাদের অবশ্যই সফলতা দেবেন। একটি হাদিসে রসুল (সা.) বলেছেন, আগে তোমার উট বাঁধ। তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কর। আরেকটি হাদিসে রসুল (সা.) বলেছেন, শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে রেলিং ছাড়া ছাদে ঘুমাবে না। কেউ যদি এমনটি করে আর রাতের বেলা ঘুমের ঘোরে ছাদ থেকে পড়ে যায়, তবে এর জন্য আল্লাহর কোনো দায়-দায়িত্ব থাকবে না। (আল আদাবুল মুফরাদ।)

নবীদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা সবাই তাওয়াক্কুলের মূর্ত প্রতীক ছিলেন। কেউই কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য বদলান না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভাগ্য বদলায়।’ (সূরা রা’দ : ১১।) দুঃখজনক হলেও সত্য! একশ্রেণির ধর্মদরদি ব্যক্তি তাওয়াক্কুলকে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সমতুল্য মনে করেন। যা সম্পূর্ণ ইসলামী চিন্তার বহির্ভূত। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃত মুমিন হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য...

comments