কাবার মালিকের প্রেমসাগরে ডুব দেওয়ার নাম হজ | মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 93 বার

কাবার মালিকের প্রেমসাগরে ডুব দেওয়ার নাম হজ | মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

আরবি ‘হজ’ শব্দের অর্থ ‘ইচ্ছা করা’। কী ইচ্ছা করা। মহান আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধুরতম ইচ্ছা মনে জাগিয়ে তোলাই হাকিকতে হজ। মক্কার অলিগলি ঘুরে বেড়ানো হলো হজের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বাইরে চকচক করলেই ভিতরে সোনা হয় না। আবার বাইরে থেকে দেখা কয়লার স্তূপেও হীরা পাওয়া যায়। অর্থাৎ একজন মানুষ হজের বাইরের সব আমল যত নিখুঁতভাবেই করুক না কেন, যদি মনের গভীরে আল্লাহপ্রেম জাগিয়ে তুলতে না পারে তাহলে সে মানুষের চোখে হাজী হতে পারলেও আল্লাহর কাছে হাজী হিসেবে দাঁড়াতে পারবে না। হজের আনুষ্ঠানিক কাজগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে ধীরে ধীরে একজন মানুষ আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। একজন হাজী প্রথমেই সেলাইবিহীন দুটি কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেয়। অর্থাৎ সে দুনিয়াবাসীকে নীরবে জানিয়ে দেয়, দুনিয়ার ভালো-মন্দ, লাভ-লোকসান, মজা-সাজার সঙ্গে একজন মৃত মানুষের যেমন কোনো সম্পর্ক নেই, আমিও তেমন একজন মৃত মানুষ হয়ে পড়েছি। এ কথার মানে হলো, তোমাদের অস্থায়ী দুনিয়া থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। আমি এখন আমার মহান মাবুদের প্রেমসাগরে ডুব দিয়ে প্রেমের বন্দরে পৌঁছার সফরে পা বাড়ালাম। এরপর সে যখন শয়তানকে পাথর মারতে যায়, তখন সে এটাই বোঝাতে চায়, হে শয়তান! বহু বছর আগে আল্লাহপ্রেমে পাগল ইবরাহিম খলিলুল্লাহকে এ পথে বাধা দিয়েছিলে। ইবরাহিম তোমাকে পাথর মেরে বিদায় করেছিলেন। আমিও এখন খলিলুল্লাহর পথ ধরেছি। আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়ার ইচ্ছা অর্থাৎ হজ করছি। এবার তুমি আমাকে ওয়াসওয়াসা দিতে এলেই তোমাকে পাথর মেরে আমি আমার রবের পথে চলতে থাকব। তারপর যখন সে মিনায় গিয়ে পশুর গলায় ছুরি চালায়, তখন সে এ ব্রত করে যে, প্রভুর যে কোনো নির্দেশের সামনে এভাবেই আমি মাথা নিচু করে দেব। প্রভুর নির্দেশ মানতে গিয়ে যদি আমার জীবনও কোরবান করতে হয়, তাতেও আমি রাজি আছি। যখন হাজী সাফা-মারওয়ায় দৌড়ায় সে কল্পনার জগতে দেখে নেয়, বহু বছর আগে মা হাজেরা এভাবেই মরণাপন্ন শিশুকে বাঁচাতে পানির খোঁজে দুর্বল দেহ নিয়ে দৌড়েছিলেন। তখন হাজী সিদ্ধান্ত নেয়, আমিও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেব। এভাবে কেউ যদি হজ করে সে হজ শেষ হওয়ার সঙ্গে ওই মানুষটি নবীজির ঘোষণামতে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। আর এমন হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া কিছুই নয়। আফসোস! আমাদের দেশে মানুষ হজ করে, কিন্তু তাদের জীবনে না আছে ইবরাহিমের ত্যাগের আদর্শ না ইসমাইলের আনুগত্যের নিদর্শন। হাজেরার মানবপ্রেম ও মানবসেবার আদর্শও আজ আর হাজীদের মধ্যে দেখা যায় না। শয়তানকে পাথর মেরে জীবনের প্রতি মুহূর্তে প্রভুর নির্দেশ পালন করার মাধ্যমে লাব্বাইকাল্লাহর স্বীকৃতি দেওয়ার মতো হাজীর সংখ্যা যদি বছরে বছরে বাড়ত তাহলে মাত্র ১০ বছরের মাথায় বাংলাদেশের চেহারাই পাল্টে যেত। আফসোস! আমরা শুধু হজের বাহ্যিকতাকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছি এত বছর, হজের হাকিকত ভেবে দেখিনি। এবার সময় এসেছে হজের হাকিকত নিয়ে ভেবে দেখার। অতীতে এমন অনেক বুজুর্গ এসেছেন, যাদের জীবনে কখনো হজ করার সুযোগ মেলেনি, কিন্তু ইবরাহিম, ইসমাইল, হাজেরার আদর্শে ছিলেন অটল। ইমাম গাজ্জালি বলেন, একবার এক জাগ্রত হৃদয়ের দরবেশ হজে গিয়ে দেখেন হাকিকতে কাবা সেখানে নেই। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! হাকিকতে কাবাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? আল্লাহ বললেন, আমার অমুক বান্দাকে জিয়ারত দেওয়ার জন্য হাকিকতে কাবা ছুটে গেছে।

কাবায় যাওয়াটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো কাবার মালিকের প্রেমসাগরে ডুব দিয়ে দুনিয়ার মোহমুক্ত-জীবন যাপন করা। আশা করি, এবারের এ হজমৌসুমে আমরা সে দৃঢ় ইচ্ছা নিজের ভিতর জাগিয়ে তুলতে পারব। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইনশা আল্লাহ আগামী বছর কাবায় গিয়ে হজের ট্রেনিং করে আসব। হে আল্লাহ! আপনি সবকিছু সুন্দর-স্বাভাবিক করে দিন।

লেখক : মুফাসসিরে কোরআন।
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments