রোজা পালনের প্রকৃত রূপ

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১ | পড়া হয়েছে 141 বার

হিজরি বর্ষের ১২ মাসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমজান। এ মাস শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হলো, পৃথিবীর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী রাসুলে আরাবি (সা.) নবুয়াতি লাভ করেন এ মাসেই। শুধু তাই নয়, সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি গ্রন্থ পবিত্র কোরআনও নাজিল হয়েছে মাহে রমজানের ২৭ তারিখ বরকতময় রাতে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘শাহরু রামাদানাল্লাজি উনজিলা ফিহিল কোরআনি হুদাল্লিন্নাসি ওয়া বায়্যিনাতিম মিনাল হুদা ওয়াল ফোরকান।’ অর্থাৎ রমজান মাসে মানুষের পথনির্দেশনা এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী পবিত্র কোরআন নাজিল করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)
পবিত্র কোরআন নাজিল এবং রাসুলের (সা.) নবুয়াতি লাভের কারণে মাহে রমজানের মর্যাদা আল্লাহর কাছে এতই বেড়ে গেছে যে, এ মাসে একটি নফল ইবাদত একটি ফরজ ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে এবং একটি ফরজ ইবাদত সত্তর গুণ বেশি বিবেচনা করা হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, একবার রাসুল (সা.) রমজানের চাঁদ দেখার পর সাহাবিদের সামনে বড় আবেগঘন ভাষায় ভাষণ দেন। ভাষণে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মাঝে এক বরকতময়-কল্যাণময় মাস এসেছে। যারা কল্যাণ লাভ করতে চাও দৌড়ে এসো। এ মাসে একটি নফল আমল ফরজের মর্যাদা পায় এবং একটি ফরজ সত্তরটি ফরজের মর্যাদা পায়।’ (বায়হাকি শরিফ)

রমজান মাসের নামকরণ সম্পর্কে মোল্লা আলী ক্বারি হানাফি (রহ.) লেখেন, আরবি ‘রমদ’ ধাতু থেকে রামাদান বা রমজান শব্দটি এসেছে। রমদ অর্থ ‘অতিরিক্ত গরম’। প্রাচীন আরবরা যখন মাসের নাম নির্ধারণ করছিলেন, ওই সময় গ্রীষ্মকালের নাম রাখেন রমজান বা অতিরিক্ত গরমের মাস। সে থেকেই এ মাসটির নাম ‘রমজান’ নির্ধারিত হয়ে যায়। (মিরকাতুল মাফাতিহ : ৪/২২৯)।
বিখ্যাত আরবি অভিধান লিসানুল আরবে বলা হয়েছে, প্রচণ্ড গরম বা উত্তাপ বোঝাতে রমদ শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন ‘রমদুস সায়েম। রোজাদারের পেট প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠেছে।’ তা ছাড়া যেহেতু রমজান মাসে বান্দার গোনাহ জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়, এ কারণেও এ মাসটির নাম রমজান হওয়া যথোপযুক্ত হয়েছে। (লিসানুল আরব : ৭/১৬২)।
তাফসিরে কুরতুবিতে ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেন, ‘আরবি সিয়াম শব্দের অর্থ বিরত থাকা বা ছেড়ে দেওয়া। বাহ্যিকভাবে সিয়াম পালন করতে হলে বান্দাকে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো মন্দ ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। আর এটাই কোরআনে বলা হয় সিয়াম সাধনার প্রাথমিক স্তর। সর্বোচ্চ স্তর হলো চিরতরে গোনাহ ছেড়ে দেওয়া বা বর্জন করা।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ৩/২৭৩)।

অবশ্য ফকিহরা বলেছেন, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া-পান করা এবং স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকলেই বাহ্যিক সিয়াম পালন হয়ে যাবে। আর প্রকৃত সিয়াম পালন করতে হলে চোখ, হাত, পা, জিহ্বা, মুখ, মন ও অন্তরকেও যাবতীয় পাপ কাজ ও পাপ চিন্তা থেকে বিরত রাখতে হবে। কোনো কোনো সুফি দার্শনিক বলেন, সারা দিন না খেয়ে থাকার নাম হলো উপবাস, যেমনটা অন্য ধর্মাবলম্বীরাও করেন। আর নিজেকে সব ধরনের পাপ কাজ ও কুচিন্তা থেকে মুক্ত করে রবের দিকে ফেরা হলো সিয়াম। এমন সিয়ামের দিকে ইঙ্গিত করেই রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা ও গিবত থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারল না তার সারা দিনের উপোস থাকার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নেই।’ (ইমাম ইবনে কাসির, কিতাবুস সিয়াম)।
বান্দা যখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজেকে গোনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখার কঠোর চেষ্টা করবে এবং একমাস এভাবে জোর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে, আশা করা যায় মাস শেষে সে মুমিন থেকে মুত্তাকির স্তরে উপনীত হবে। সিয়াম সাধনার মূল টার্গেটও তাই। সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আশা করা যায়, তোমরা মুত্তাকি হতে পারবে।’
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি

লেখাটি সময়ের আলো পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com