শোনার সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেওয়াই ইমানের দাবি

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | বুধবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ | পড়া হয়েছে 239 বার

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

এ ধরনের পোস্ট প্রায়ই দেখি। ব্যক্তিগতভাবে কথাও বলেছি কয়েকজনের সঙ্গে। তারা জানান, ধর্মের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিষয়ে আলোচনা করতে করতে একটা পর্যায়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলার অবস্থায় পৌঁছে যায় তারা। তাদের মনে হয় নবী-ওহি, জিবরাইল, কোরআন নাজিল এ সব বিষয়ই মিথ্যা। যুবকদের এসব কথা শুনে এক অজানা ভয় আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে। আগামী দিনের তরুণরা কি তাহলে অবিশ্বাসের পথে এগিয়ে চলছে? ধর্ম নিয়ে অবিশ্বাস কিংবা সন্দেহের বিষয়টি সবাই মুখ উচ্চারণ না করলেও অনেকেই মনে মনে প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন এর ব্যাখ্যা কী? এটা কেন হলো? এভাবে হওয়া কি সম্ভব? এর বাস্তবতা কতটুকু ইত্যাদি। মানুষের বুদ্ধিতে সব বিষয়ের যুক্তি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বিজ্ঞান চেষ্টা করছে, দর্শনও চেষ্টা করছে। সফলতা আসছে। আবার আছে ব্যর্থতাও। তবে ধর্মের এমন অনেক মৌলিক বিষয় আছে যেগুলো বিজ্ঞান কিংবা দর্শনের অনেক ঊর্ধ্বে। হয়তো কখনো বিজ্ঞান এগুলোকে ছাড়িয়ে যেতেও পারে। কিংবা পারবে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তা ও পরকাল সংক্রান্ত কোনো বিষয়ই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণিত হয়নি বলেই যে এসব বিষয় মিথ্যা তা কিন্তু নয়। যেমন অক্সিজেন আবিষ্কার হয়েছে ১৭৭৪ সালের ১ আগস্ট। ইংরেজ রসায়নবিদ ও খ্রিস্টান যাজক স্যার জোসেফ প্রিস্টলি প্রথম অক্সিজেন আবিষ্কার করেন। তাঁর গবেষণার আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন বাতাসে মাত্র দুই ধরনের অক্সিজেনের অস্তিত্ব রয়েছে-হাইড্রোজেন ও কার্বন-ডাইঅক্সাইড। কিন্তু স্যার প্রিস্টলি দেখিয়েছেন, বাতাসে অন্তত আরও ১০ ধরনের গ্যাসের উপাদান রয়েছে। তার মানে কি এত হাজার বছর ধরে বাতাসে অক্সিজেন ছিল না? অবশ্যই ছিল। তাই বিজ্ঞান কোনো বিষয় প্রমাণ করতে পারেনি বলেই যে বিষয়টি সঠিক নয়- এমনটি বলা মানে বোকার স্বর্গে বসবাস করা।

মুসলমান তরুণদের ভালো করে মনে রাখতে হবে, ইসলামের বিশ্বাসযোগ্যতা বা যৌক্তিকতা বিজ্ঞান-দর্শনের যুক্তি-প্রমাণের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে নিঃসংকোচে মেনে নেওয়ার ওপর। এটাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। সুরা বাকারায় আল্লাহতায়ালা মুমিনদের মোনাজাত কেমন হবে তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। সেখানে একটি দোয়া এরকম- ‘মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে যে বিধিবিধান নাজিল হয়েছে, রসুল এবং তার সঙ্গী বিশ্বাসীরা তাতে পুরোপুরি বিশ্বাস করে। আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর প্রেরিত কিতাব ও তাঁর রসুলগণকে তারা সবাই বিশ্বাস করে। তারা বলে, আমরা আল্লাহর রসুলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমরা তোমার নির্দেশ শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমরা তোমার কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৮৫)। এ আয়াত প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রয়াত ইসলামিক স্কলার ড. ইউসুফ আল কারাজাভি (রহ.) বলেছেন, শোনার সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেওয়াই ইমানের দাবি। মুমিন যখন শুনবে এটা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নির্দেশ- সে আর কোনো যুক্তি-প্রমাণ খুঁজবে না। যুক্তি-প্রমাণ খোঁজা আসলে নফসের চাহিদা পূরণের নাম। মুমিন আর অন্যদের মাঝে পার্থক্য হলো, অন্যরা নফসের চাহিদাকে আগে পূরণ করে। আর মুমিন নফস ও অন্য সব মাখলুকের চাহিদার আগে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের চাহিদা পূরণ করে। মুমিন তার কামনা-বাসনা আনুগত্য থেকে বের হয়ে আল্লাহর আনুগত্য করবে এটাই ইমানের দাবি। ইমানের আরও দাবি হলো, জীবনের লাগাম সে আল্লাহর হাতে দেবে, যেন ওহির আলোকে সে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ চলতে পারে। আল্লাহতায়ালা বান্দাকে বলেছেন, আমি তোমাকে এই আদেশ করেছি আর এই নিষেধ করেছি। জবাবে বান্দা বলবে, আমি শুনলাম এবং বাস্তবায়ন করলাম। মুমিনের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে একই কথা আল্লাহ অন্য আয়াতে এভাবে বলেছেন, ‘বিশ্বাসীদের যখন তাদের নিজেদের কোনো বিষয় ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসুলের দিকে ডাকা হয়, তখন তারা শুধু বলে, ‘আমরা শুনলাম ও মানলাম।’ এরাই সফল। (সুরা নূর, আয়াত ৫১) আল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রসুল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে অমান্য করলে সে নিশ্চিতই পথভ্রষ্ট।’ (সুরা আহজাব, আয়াত-৩৬)।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পীরসাহেব আউলিয়ানগর

লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

 

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com