উম্মতের জন্য রমজানের ৫টি উপহার
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
চলছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। রোজা রাখতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কখনও কখনও রোজাদার বান্দা ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে পড়ে। সব রকম খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের সুযোগ ও সাধ্য থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কষ্টকে সে তুচ্ছ মনে করে। এ কারণে তাকে এমন পুরস্কারে ভূষিত করা হবে, যা হবে তার ক্ষুৎপিপাসার যথার্থ বিনিময়।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসে আমার উম্মতকে পাঁচটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগের কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। ১. রমজানের প্রথম রাতে আল্লাহ তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন, আর আল্লাহ যার দিকে দৃষ্টি দেন, তাকে কখনও শাস্তি দেন না। ২. সন্ধ্যার সময় তাদের মুখ থেকে যে গন্ধ বের হয়, তা আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম। ৩. প্রত্যেক দিনে ও রাতে ফেরেশতারা রোজাদারদের জন্য দোয়া করেন। ৪. আল্লাহতায়ালা তাঁর বেহেশতকে বলেন, ‘তুমি আমার বান্দার জন্য সুসজ্জিত ও প্রস্তুত হও! আমার বান্দারা খুব শিগগিই দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট থেকে অব্যাহতি পেয়ে আমার বাড়িতে ও আমার সম্মানজনক আশ্রয়ে এসে বিশ্রাম নেবে।’ ৫. রমজানের শেষ রাতে আল্লাহ তাদের সব গোনাহ মাফ করে দেন।’
এক ব্যক্তি বলল, ‘এটা কি লাইলাতুল কদর?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘না, তুমি দেখোনি শ্রমিকরা যখন কাজ শেষ করে, তখনই পারিশ্রমিক পায়?’ (সুনানে বায়হাকি)।
এসব ফজিলত ও বরকত লাভ করতে হলে রোজা রাখতে হবে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য ও তারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। যদি বান্দা সমাজ ও পরিবেশের চাপে পড়ে সিয়াম পালন করে, আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ ও তাঁর সন্তুষ্টির পরিবর্তে লোকলজ্জা থেকে রেহাই পাওয়া বা ধার্মিকরূপে প্রশংসা কুড়ানোই যদি হয় তার সিয়াম পালনের উদ্দেশ্য, তবে সিয়ামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সে সফল হতে পারবে না।
তাই রাসুল (সা.) সুস্পষ্ট ভাষায় উম্মতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রোজা রাখতে হবে। কেননা এমন সিয়ামই শুধু আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য যার মূল উপাদান হচ্ছেÑ ঈমান ও ইহতিসাব। এরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানে উজ্জীবিত হয়ে পুণ্যের আশায় রমজানের সিয়াম পালন করবে তার পূর্বজীবনের গোনাহখাতা ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি)।
রোজার বাহ্যিকরূপ তথা বিধি-বিধানের প্রতি যেরকম সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, তেমনি সিয়ামের হাকিকত ও মর্ম এবং সিয়ামের উদ্দেশ্য জানার জন্যও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কাজেই একদিকে যেমন পানাহার বর্জন ও জৈবিক চাহিদা পরিহার করে চলতে হবে, তেমনি এমন সব অন্যায় ও অপরাধ পরিহার করতে হবে, যা সিয়ামের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী, সিয়ামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থি এবং সিয়ামের নৈতিক ও চারিত্রিক সফলতা লাভের পথে অন্তরায়।
বিশ্বখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ আরকানে আরবায়া গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সিয়ামের সাধককে নিষেধাজ্ঞা পালনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিবাচক বিষয়াবলির প্রতিও যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করতে হবে। পানাহার ও জৈবিক চাহিদা বর্জন, গিবত ও পরনিন্দা পরিহার, ঝগড়া-বিবাদ ও যাবতীয় অশ্লীলতা ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে ইবাদত, তেলাওয়াত, জিকির ও তাসবিহ-তাহলিল এবং সালাত ও সালামে নিমগ্ন থেকে সমবেদনা, সহানুভূতি, সদয় আচরণ ও দানশীলতার মাধ্যমে সিয়ামের প্রভাবকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। তাহলেই লাভ করবে সিয়াম সাধক আল্লাহ ঘোষিত অফুরন্ত প্রতিদান।’
আল্লাহ আমাদের অবশিষ্ট রোজাগুলো তার সন্তুষ্টির নিয়তে পালন করে তার বিশেষ নেয়ামতে ধন্য করুন। আমিন!
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাস্সির সোসাইটি
