মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
পাশেই আমার সফরসঙ্গী। সামনের সিটের পিছন দিকটায় মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। ভিক্ষুক লোকটা এতই বিরক্তির ছিল যে, প্রতিটি ঘুমন্ত ব্যক্তিকেই ডেকে তুলে ভিক্ষা চাইছিল। আমার সফর সঙ্গীকে যখন ঘুম থেকে জাগানোর জন্য জোরে জোরে ‘এই যে ভাইয়া দেখেন’ বলে ডাকতে শুরু করল, তখন আমি অনেকটা বিরক্তি মেশানো গলায় বললাম, ‘দেখতেই তো পাচ্ছেন মানুষটা ঘুমাচ্ছে…।’ এতটুকু বলেই আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। এখন দেখলাম, লোকটার দুই হাত সিনা থেকেই কাটা। মনের ভিতর কে যেন হামার দিয়ে বাড়ি দিল। ভিতরে বয়ে যাওয়া একটি ঠান্ডা স্রোত আমাকে নিস্তেজ করে দিল। কত ভিক্ষুক দেখেছি। পঙ্গু, পা নেই, এক হাত নেই, বিকলাঙ্গ; কিন্তু একেবারেই দুই হাত নেই এমন ভিক্ষুক প্রথম দেখলাম। আহারে, মানুষের কাছে চাইতে হলে বা মানুষের থেকে কিছু নিতে হলে তো হাত বাড়িয়েই নিতে হয়। কিন্তু লোকটার তো সে হাতই নেই। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ভিক্ষুকটি চলে গেল এবং বাস আবার ছুটতে শুরু করেছে টেরই পায়নি।
তার এক দিন পর দুপুরের ঘটনা। খুব একটা বাইরে খাওয়া হয় না তাই শখ করে মধ্যাহ্নভোজের জন্য এসেছি মতিঝিলের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয়। সবচেয়ে কম মূল্যের এক প্লেট খাবারের দাম ৩০০ টাকা। আমি একাই ৩০০ টাকার খাবার অনেকবার খেয়েছি। কিন্তু সেদিন দুপুরে যা দেখলাম তাতে চোখ ছানাবড়া অবস্থা। এই দুর্মূল্যের বাজারে এত দামি খাবার খাওয়ার জন্য আমাকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। আগেই বলেছি, রেস্তোরাঁটি অভিজাত। মানে বসার পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। তবুও এত ভিড়!হঠাৎ কানে ভেসে উঠল সেই ডাক, ‘এই যে ভাইয়া, দেখেন…কিছু দ্যান!’ মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল। নিজেকে এত অপরাধী মনে হলো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার সঙ্গে মেহমান ছিল। তিনি বললেন, হঠাৎ আপনি গম্ভীর হয়ে গেলেন কেন? আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। একজন ভালো মানুষের কাজ হতো যদি সঙ্গে সঙ্গে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে যেতে পারতাম। লজ্জায় অতিথিকে সে কথা বলতে পারিনি। খাওয়ার সময় খাবার সামনে নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি, গলা দিয়ে খাবার নামেনি। অনেকবারই মেহমানের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যের হাসি হেসেছি। বিখ্যাত লেখক শিবখেরা বলেছেন, হাসি সুন্দর, কিন্তু তা যদি হয় আন্তরিকতাশূন্য তবে এরচেয়ে বিশ্রী আর কিছু নেই। সেদিন মেহমানও বুঝতে পেরেছেন আমি শুধু নিয়ম রক্ষার হাসিই হেসে গেছি কেবল, মনটা পড়েছিল অন্যখানে।
প্রভুকে বললাম, হে আল্লাহ! পৃথিবী থেকে ধনী-গরিবের এই জঘন্য বৈষম্য দূর করার তাওফিক আপনি আমাকে দিন। যেন আর কোনো বনি আদম একবেলা খাওয়ার জন্য মানুষের কাছে হাত না পাতে। আরেকটি কথাও আল্লাহর কাছে বলেছি। তা হলো, আমরা যারা খাওয়ার পিছনে প্রতিযোগিতা করে অপব্যয় করি, তাদের মনে যেন ওই সব মানুষের জন্য একটু দয়া সৃষ্টি করেন। আমিন।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি।
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…
