মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
আমরা দেখেছি, প্রসিদ্ধ তিন মাজহাবেরই কোরবানির ব্যাপারে মত হচ্ছে তা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এসব ইমাম ছাড়াও অনেক তাবেয়ি ও সালফে সালেহিন কোরবানিকে ওয়াজিব মনে করেননি। এসব বিজ্ঞ আলেম কোরবানিকে সুন্নত বলার দলিল হিসেবে প্রিয় নবী (সা.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন। যেখানে রসুল (সা.)-এর বরাতে বলা হয়েছে : ‘যাদের কোরবানি করার ইচ্ছা আছে জিলহজ শুরুর হওয়ার পর তারা যেন নিজেদের নখ, চুল ইত্যাদি না কাটে।’ (মুসলিম)। এ হাদিসের ভাষা থেকে বোঝা যাচ্ছে, কোরবানি করা আবশ্যক নয় বরং ঐচ্ছিক। যদি আবশ্যক হতো তাহলে রসুল (সা.) ‘যাদের কোরবানি করার ইচ্ছা আছে’ এ ধরনের কথা বলতেন না।
সালফে সালেহিনরা কোরবানিকে সুন্নত বলেন আরেকটি বর্ণনার ভিত্তিতে। বায়হাকির এক বর্ণনায় এসেছে, ‘হজরত আবুবকর ও ওমর (রা.) ওয়াজিব হয়ে যাওয়ার ভয়ে এক-দুই বছর কোরবানি করেননি।’ যদি কোরবানির বিধান ওয়াজিবই হতো তাহলে এই মহান সাহাবিরা কোরবানি ছাড়তেন না।
এ তো গেল তিন মাজহাবের ফতোয়া। কোরবানি সম্পর্কে আমাদের মাজহাবের ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া হলো : কোরবানি করা ওয়াজিব। সালফে সালেহিনদের মধ্যে ইমাম রাবিয়াতুর রায়, আওজায়ি, লাইস বিন সাদ মিসারি, সুফিয়ান সাওরি, ইবরাহিম নাখয়ি, মুজাহিদ, মাকহুল শাবি (রহ.) কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ফতোয়া দিয়েছেন। ইমাম মালেক (রহ.)-এর এক মতেও কোরবানি ওয়াজিব ফতোয়া পাওয়া যায়।
কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার দলিল হিসেবে সুরা কাওসারের এ আয়াত দুটি উল্লেখ করা হয় : ‘হে নবী! নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। তাই আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাওসার ১-২)। এ আয়াতের ব্যাখ্যা হলো : ‘হে রসুল! আপনাকে আমি কাওসার নামক নেয়ামত দান করেছি। তাই আপনি ঈদের নামাজ আদায় করুন এবং নহর তথা কোরবানি করুন ওই প্রভুর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এবং তাঁরই নামে। আল্লাহর এ নির্দেশের কারণে ঈদের নামাজ যেমন ওয়াজিব, কোরবানিও ওয়াজিব।’ কোরবানির ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে হাদিসের দলিল হলো : আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নম্বর ৩১২৩)। ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) বলেন, ‘হাদিসটি কোরবানি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে কঠিন ধমকি। আর এমনটি হয় ওয়াজিব তরককারীদের ক্ষেত্রে। হাদিসটিকে ইমাম হাকেম সহি বলেছেন। ইমাম জাহাবি তালখিসেও সহি বলেছেন। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারিতে হাদিসটি সহি বলে রায় দিয়েছেন। আল্লামা আইনি বলেন, হাদিসটির সনদ বুখারি-মুসলিমের সমতুল্য। হজরত জাবের (রা.) বলেন, রসুল (সা.) মদিনায় ঈদের নামাজ পড়িয়েছেন। কিছু লোক নামাজের আগেই কোরবানি করে ফেলেছেন এ ধারণায় যে, হয়তো রসুল (সা.)ও কোরবানি করে ফেলেছেন। বিষয়টি জানতে পেরে রসুল (সা.) ঘোষণা করলেন, যারা নামাজের আগে কোরবানি করেছে তাদের অবশ্যই আবার কোরবানি করতে হবে। আর তোমরা কেউ রসুলের আগে কোরবানি করবে না।’ (মুসলিস, হাদিস নম্বর-১৯৬৪)। এ হাদিসও প্রমাণ করে কোরবানি করা ওয়াজিব। যদি কোরবানি ওয়াজিব না হতো, তাহলে রসুল (সা.) আবার কোরবানির আদেশ দিতেন না।
লেখক : চেয়ারম্যান বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি
পীরসাহেব, আউলিয়ানগর
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…
