ইহরামের শুভ্রতার মতোই হজপরবর্তী জীবনে পবিত্রতা ধরে রাখতে হবে

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | শুক্রবার, ২৯ জুলাই ২০২২ | পড়া হয়েছে 80 বার

পবিত্র হজ পালন শেষে দেশে ফিরছেন হাজীরা। হজ মানুষের অতীত গুনাহ মাফ করে দেয়। শুভ্র এক নতুন জীবন দান করে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য, হজের রেশ কাটতে না কাটতেই শয়তানের পাল্লায় পড়ে অনেকে হজের শিক্ষা ভুলে যান। ফের অন্যায়-অপরাধে জড়িয়ে নিজেকে কলুষিত করেন। হাজীরা হজপরবর্তী জীবন কীভাবে কাটাবেন- পবিত্র মদিনায় বসে সে সম্পর্কে সময়ের আলোকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটির চেয়ারম্যান ও হজ প্রশিক্ষক মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নূর আহমাদ|
সময়ের আলো : সদ্য হজ সমাপনকারীদের মর্যাদা  সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
সেলিম হোসাইন আজাদী : হজ শেষ হয়েছে। বিদায়ের সুর বেজে উঠেছে পবিত্র কাবার আঙিনায়। যার যার দেশে ফিরে যাচ্ছেন হাজীরা। কাবার আকাশ-বাতাস এখন কাবাপ্রেমীদের চোখের জলে আর্দ্র হয়ে আছে। বুকে বুকে একই কান্নার ধ্বনি- জীবনে আর কি দেখা হবে হে কাবা তোমার সঙ্গে? এক জীবনে আর কি দাঁড়াতে পারব হে নবী আপনার সামনে? এমন প্রশ্ন নিয়েই দেশে ফিরছেন বেশিরভাগ হাজী। রাসুুল (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী সুন্দরভাবে হজ সম্পাদনকারী প্রতিটি হাজীই সদ্য ভ‚মিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ। এজন্যই রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হজ শেষ করে কেউ যদি আমার কবর জিয়ারত করতে আসে, তাহলে সে যেন আমার সঙ্গে জীবিত অবস্থায় দেখা করল।’
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, ‘হজ শেষ করার পর মানুষ নিষ্পাপ মাসুম হয়ে যায়। তাই সে যখন পবিত্র আত্মা নিয়ে রাসুল (সা.)-এর কবরের পাশে দাঁড়ায়, তখন রাসুল (সা.)-এর রুহ তার সঙ্গে দেখা করে। অবস্থা এমন হয় যেন, দুজনে তারা জীবিত অবস্থায় দেখা করল।’ (শরহে মুসলিম)। সাধারণ মানুষ যেন হজ মৌসুমে ফোটা ‘হাজী ফুল’ থেকে খুশবু নিয়ে খোশ নসিবের অধিকারী হতে পারে তাই প্রিয় নবী (সা.) হাজীদের সঙ্গে সালাম ও মুসাফাহার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাবরানি শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো হাজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাকে সালাম বলবে, তার সঙ্গে মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করবে এবং দোয়ার আবেদন করবে। কারণ কবুল হজকারীর সব পাপ আল্লাহ মাফ করে দেন। যে ব্যক্তি হজ থেকে ফিরে এসেছে সে যেন আজই মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছে।’
সময়ের আলো : হজপরবর্তী জীবন কেমন হওয়া উচিত?
সেলিম হোসাইন আজাদী : পৃথিবীর বুকে পবিত্রতম ঘর কাবা। মহান রাব্বুল আলামিনের রহমতের বারিধারা সরাসরি যেখানে বর্ষিত হতে থাকে। পবিত্র সে আঙিনায় প্রবেশ করা মানেই জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। পাপ-পঙ্কিলতা ঝেড়ে পূত-পবিত্র জীবন শুরু করা। ইহরাম পরার সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক জীবন শুরু হয়ে যায়। যে জীবনের সঙ্গে দুনিয়ার জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। হজের দিনগুলোতে এই দুনিয়াবিমুখ জীবনের চর্চাই করেছেন হাজীরা। কাফনের কাপড়ের মতো দুই টুকরো সাদা ইহরামে নিজেকে জড়িয়ে ঘোষণা করেছেন- লাব্বাইক আল্লাহ! হে আল্লাহ! রঙিলা দুনিয়ার রঙের জীবন থেকে আমি ফিরে এসেছি। ফিরে এসেছি তোমার কাছে। লাব্বাইক আল্লাহ! লাব্বাইক! এই দুনিয়ার পোশাক খুলে কবরের পোশাক পড়ে আত্মসমর্পণের যে ট্রেনিং হাজীরা নিয়েছেন, এখন বাস্তব জীবনে এসে সেই ট্রেনিং অনুযায়ী জীবন পরিচলানা করতে হবে। সম্মানিত হাজী সাহেবদের উদ্দেশে বিশেষভাবে বলব- আপনি যখন ব্যবসায় ফিরে যাবেন, তখন আগের মতো আর ভেজাল ও দুনম্বরি কাজ করতে পারবেন না। চাকরিতে আপনি ঘুষ-অপরাধ-অন্যায়ের সঙ্গে জড়াতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিজীবনেও কারও সঙ্গে মন্দ ব্যবহার, জোর-জুলুম করা আপনার জন্য শোভনীয় নয়। অন্যায়ভাবে, অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন তো তারা করে, যারা ভুলে গেছে কবরের কথা। কিন্তু আপনি কেন মিথ্যা বলে, দুনম্বরি করে পয়সা উপার্জন করবেন? যদিও আপনি দুনিয়াতেই আছেন, কিন্তু আপনি তো আরাফার ময়দানে, মুজদালিফার প্রান্তরে ফকিরের বেশে মরার পোশাক পরে জানিয়ে দিয়েছেন- এ দুনিয়ার সঙ্গে, দুনিয়ার মানুষগুলোর সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই!
সময়ের আলো : কিন্তু এভাবে দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপন তো সহজ ব্যাপার নয়!
সেলিম হোসাইন আজাদী : আসলেই তাই। কিন্তু হজ মানুষকে সে শিক্ষাই দেয়। দুনিয়ায় থেকেই দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপন করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাজ করবে, জীবন-ধারণের জন্য অর্থ উপার্জন করবে। তবে কেবল দুনিয়া দুনিয়া করা যাবে না! যদিও দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত জীবনযাপন চাট্টিখানি কথা নয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘হুব্বুদ দুনিয়া রাসিন কুল্লু খাতিয়াহ। দুনিয়াসক্তিই সব গুনাহ-দুর্গতির মূল।’ একজন হাজী দুনিয়াসক্ত জীবনযাপন করবে, আবার আল্লাহর প্রিয় হওয়ার দাবি করবে- এটা কখনই হতে পারে না। রাসুল (সা.) খুব আফসোসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন, ‘এমন একসময় আসবে মানুষ হজ করবে কিন্তু হজের কোনো প্রভাব তাদের মাঝে থাকবে না।’ আমার প্রিয় ভাই, রাসুলের এই আফসোস বাণী যেন আপনার জীবনে সত্য না হয়। আপনার জীবনে যেন সেই বাণীটিই সত্য হয়ে ফোটে, যেমনটি রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ যখন হজ করে আসে, তখন সে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। কবুল হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া কিছুই নয়।’ হে বাইতুল্লাহর মুসাফির! হজের ঘ্রাণ এখনও আপনার শরীরে লেগে আছে। হজের সুবাস এখনও আপনার আত্মায় বিরাজ করছে। আপ্রাণ চেষ্টা করুন, যেন মৃত্যু পর্যন্ত এ ঘ্রাণ-সুবাস ধরে রাখতে পারেন। যদি একটু চেষ্টা করে হজের ঘ্রাণ আত্মায় জারি রাখতে পারেন, তবে চোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী জান্নাতের মেহমান হয়ে যাবেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হজের ঘ্রাণ নিয়ে জীবনযাপন করার তওফিক দিন। মৃত্যুর পর অনন্য সুন্দর জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।

 

 

সময়ের আলো : তবুও শয়তানের ধোঁকায় অনেকে গুনাহে জড়িয়ে যায়, এ ব্যাপারে কী বলবেন?

 

 

সেলিম হোসাইন আজাদী : দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের সমাজে এমন হাজীর সংখ্যাই বেশি দেখা যায়। আমরা বছরে বছরে হজ করি, কিন্তু হজের কোনো প্রভাব আমাদের মাঝে পড়ে না। দুনিয়ার প্রতি প্রেম-মহব্বত থেকেই যায়। কেউ হয়তো এবারই প্রথম হজ করেছেন, কেউ হয়তো অনেকবার। আপনাদের সবার কাছে একটি কথাই জিজ্ঞেস করতে চাই, হজের আগের জীবন আর হজের পরের জীবনের মধ্যে যদি কোনো পার্থক্য না থাকে, তবে হজের বিশেষত্ব কোথায়? হজ মানে কি বছর বছর দুর্নীতি অন্যায়ের সমুদ্রে ডুবে থেকে মক্কা নামক নদীর পানিতে ডুব দিয়ে এলাম আর সব গুনাহ মাফ হয়ে গেল, এমন? যদি তাই হতো তাহলে নবীজি (সা.) কেন আরাফার ময়দানে লাখো উম্মত থেকে পাপ না করার ওয়াদা নিয়েছিলেন? কেন তিনি সুদ, দুর্নীতি, মানবতার অপমানের মতো অন্যায়গুলোর ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন? তিনি তো বলতে পারতেন, তোমরা হজ করে ফেলেছ, এখন আর তোমাদের কোনো গুনাহ নেই। যেমন খুশি পাপের জীবনযাপন করো। না। নবীজি (সা.) বলেছেন, এতদিন পর্যন্ত যে যা অন্যায় করেছ সব মাফ, এখন থেকে সাচ্চা মানুষ হয়ে যাও। খাঁটি মুমিন হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করো। তবেই তোমাদের জন্য আল্লাহর জান্নাত অপেক্ষা করছে। সম্মানিত হাজী সাহেবানদের আমি আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- হজ মানে হলো ইচ্ছা করা। শপথ করা। দীর্ঘ এক মাসের ট্রেনিংয়ে আপনি ভালো হবেন শুধু এই শপথ করে এসেছেন। এখন আপনার চলাফেরার ওপর নির্ভর করবে আপনি আরাফার ময়দানে ভালো মানুষ হওয়ার যে ইচ্ছা করেছেন, তা কি সঠিক ছিল, না লৌকিকতা আর কটপতায় পূর্ণ ছিল? আমরা বিশ্বাস করি, আপনি আন্তরিকভাবেই খাঁটি মানুষ হওয়ার শপথ নিয়ে, মক্কার অলিগলি ঘুরে নবীজির রওজা থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহপাক আপনাকে হজের শপথ বাস্তবায়নের তওফিক দিন। খাঁটি মানুষ হয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার তওফিক দিন।

 

 

লেখাটি সময়ের আলো প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com