মানুষের হেদায়াতের লক্ষ্যে পবিত্র কোরআন বিভিন্ন কৌশলে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। উপমা ও প্রবাদ বাক্যের ব্যবহার তেমনই একটি কৌশল।
উপমা ব্যবহার করা হয় মূলত না বোঝা কোনো দৃশ্য বা প্রেক্ষাপটকে বোঝানোর জন্য শ্রোতার বোধগম্য কোনো দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করে। এ তুলনাকে আরবিতে ‘মিসাল’ বলে। আল কোরআনে ব্যবহূত উপমাসমূহ নিয়ে রচিত হয়েছে ‘আমসালুল কোরআন’ নামক স্বতন্ত্র শাখা। মিসাল বা উপমা হলো, কোনো ভাবকে নান্দনিকভাবে প্রকাশ করা, যা হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে। অন্যভাবে বলা যায়, মিসাল হলো এমন কিছু বাক্য যা বক্তার মূূল কথাকে শ্রোতার বোধগম্য করার জন্য বলা হয়েছে। (মাবাহেস ফি উলুমিল কোরআন : ২৮৩)। পবিত্র কোরআনে এ ধরনের অনেক উপমার ব্যবহার করা হয়েছে। এ সম্পর্কে রসুল (সা.) এক হাদিসে বলেন, ‘কোরআনের আয়াতগুলো পাঁচ ভাগে বিভক্ত। হালাল, হারাম, মুহকাম, মুতাশাবিহাত ও আমসাল বা উপমাবলি। সুতরাং তোমরা হালাল জান, হারাম ছাড়। মুহকাম খোঁজ, মুতাশাবিহাতের ওপর বিশ্বাস রাখ। আর উপমাগুলো থেকে উপদেশ নাও। ’ (মুতারেকুল আরেফিন ৪৬৪)।
আল কোরআনে মোট তিন ধরনের উপমা লক্ষ্য করা যায়। স্পষ্ট উপমা, সুপ্ত উপমা, বহুল প্রচলিত কথা-প্রবাদ-বচন। (মাবাহেস : ৪৮)। স্পষ্ট উপমা হলো ওই আয়তগুলো যাতে ‘মিসাল-উপমা’ শব্দটি স্পষ্ট রয়েছে। যেমন, ‘ওয়াদরিব লাহুম মাসালান আসহাবাল কারয়িয়াহ- তাদের কাছে সেই জনপদের বাসিন্দাদের উপমা তুলে ধরুন। ’ (সূরা ইয়াসিন : ১৩)। ‘ইন্নামা মাসালুল হায়াতিদ দুনিয়া-তাদের কাছে দুনিয়ার জীবনের উপমা তুলে ধরুন। ’ (সূরা ইউনুস : ২৪)। পবিত্র কোরআনের প্রায় চল্লিশ জায়গায় এ ধরনের উপমা ব্যবহূত হয়েছে। (আমসালু ফিল কোরআনিল কারিম : ৫৭)। উপমা দেওয়া হয়েছে কিন্তু ‘মিসাল-উপমা শব্দ’ ব্যবহার করা হয়নি- এ ধরনের উপমাকে সুপ্ত উপমা বলে। সুপ্ত উপমার সংজ্ঞায় জালালুদ্দিন সুয়ূতি বলেন, ‘উপমাব্যঞ্জক শব্দের স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও এ ধরনের বাক্য এমন ভাব প্রকাশ করে যা উপমার মতোই এবং উপমা ব্যবহারের মতোই উপকার দেয়। ’ (আল ইতকান : ২/১৬৭)। যেমন সূরা ফুরকানে আল্লাহ বলেন, ‘তারা যখন খরচ করে, তখন অপব্যয়ও করে না, কার্পণ্যও করে না। বরং এ দুয়েই মাঝামাঝি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। (সূরা ফুরকান : ৬৭)। এখানে মুমিনদের খরচের উপমা দেওয়া হয়েছে ‘উপমা’ শব্দ প্রয়োগ না করেই। আল্লামা মুফতি তকী উসমানী লিখেন- আল কোরআনে দুই ধরনের প্রবাদবাক্য ব্যবহূত হয়েছে। এক. যে ধরনের প্রবাদ আগে কখনো প্রচলিত ছিল না, কোরআন নাজিল হওয়ার পরই তা প্রবাদ হিসেবে প্রচলিত হয়। অর্থাৎ এ ধরনের প্রবাদের আবিষ্কারক খোদ কোরআন। যেমন, ‘কল্যাণের প্রতিদান কেবল কল্যাণই। ’ (সূরা রহমান : ৬০)। দুই. এমন কিছু প্রবাদ আছে যার মূল সারমর্ম অন্যভাবে কোরআনে ব্যবহার হয়েছে। যেমন আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘শোনা কথা চোখে দেখার মতো হয় না। ’ ঠিক এ কথাটিই কোরআনে ব্যবহার হয়েছে ভিন্নভাবে। আল্লাহর প্রশ্নের জবাবে ইব্রাহিম (আ.) বলেছিলেন, ‘চোখের দেখা অন্তরকে প্রশান্ত করে। ’ (সূরা বাকারাহ : ২৬০)। (উলুমুল কোরআন : ২৯৪)। বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে, পরের জন্য গর্ত করলে সে গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়। এ প্রবাদটি আরবিতেও ব্যবহার হয়। ঠিক একই কথা পবিত্র কোরআন বলেছে ভিন্নভাবে। ‘চক্রান্ত শেষ পর্যন্ত চক্রান্তকারীকেই ঘিরে ফেলে। ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরই সর্বনাশ করে। (সূরা ফাতির : ৪৩)।
আল্লামা মাওয়ারদী বলেন, কোরআনে বর্ণিত জ্ঞানের বড় অংশ এর উপমাবলি। কিন্তু মানুষ এ থেকে গাফেল। কারণ মানুষ উপমার শাব্দিক ও বাক্য সৌন্দর্য নিয়েই ব্যস্ত। উপমার শিক্ষা ও বাস্তবিক প্রয়োগ অন্বেষণে তারা সময় ব্যয় করে না। তবে যারা প্রকৃত জ্ঞানী, যাদের অন্তর জাগ্রত তারাই কেবল উপমাবলি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। আল্লাহপাক এ জ্ঞানীদের উদ্দেশেই বলেছেন, ‘আমরা মানুষের জন্য দিয়ে থাকি এসব উপমা, কিন্তু জ্ঞানীরা ছাড়া কেউ তা বোঝে না। ’ (আল আনকাবুত : ৪৩)। উপমার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মানুষকে সতর্ক করেন, ভয় দেখান। আবার কখনো আশান্বিত ও উদ্দীপ্ত করেন। এসব উপমা মুমিন হৃদয়ে শুধু ঝঙ্কারই তুলে না, আশাও জাগায়। উপমার প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা উল্লেখ করে আল্লাহ নিজেই বলেন, ‘আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন না মশা বা তার চাইতেও ক্ষুদ্র কোনো প্রাণীর উপমা দিতে। তবে যারা ইমান এনেছে তারা জানে, নিঃসন্দেহে এটা তার প্রভুর পক্ষ থেকে আসা মহাসত্য। আর যারা কুফরি পথ অবলম্বন করেছে তারা বলে, এ উপমা দিয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্য কী? এভাবে একটি উপমা দিয়ে আল্লাহ অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে প্রদর্শন করেন সঠিক পথ। ’ (সূরা বাকারাহ : ২৬)। হে আল্লাহ! জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রাণগ্রন্থ আল কোরআনকে আমাদের চলার পথের সাথী করে দিন। আমরা যেন কোরআনকে জীবনের সুখ-দুঃখের পাথেয় বানাতে পারি।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
এই লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয়েছে। দেখতে হলে ক্লিক করুন…
