নিজেকে বদলে নেওয়ার মাস মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | বৃহস্পতিবার, ০১ জুন ২০১৭ | পড়া হয়েছে 584 বার

রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত এতটাই বরকতময় যে, এ মাসে পালন করা নফল কাজগুলো ফরজ কাজের মর্যাদা পায়, আর ফরজ কাজগুলো সত্তরগুণ মর্যাদা পায় (বায়হাকি)। রমজান মাস এলে রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, সৎ পথে চলার পথ সহজ হয়ে যায়, শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করা হয় (বুখারি ও মুসলিম)।

তবে আফসোস তাদের জন্য যারা রমজানের মোবারক এ মাস পেয়েও অলসতা আর উদাসীনতায় পুরোটি মাস কাটিয়ে দেয়। উদাহরণ দেওয়া যায় বৃষ্টির পানি অনুর্বর ভূমিতে পড়লে ভূমি তা থেকে উপকৃত হতে পারে না, কিন্তু সেই পানি উর্বর ভূমিতে পড়লেই ফসল লক লক করে ওঠে।   তেমনি রমজান থেকে কে কতটুকু উপকৃত হবে তা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, কর্মপ্রচেষ্টা আর আমলের ওপর। রসুল সা. বলেন, অনেক রোজাদার আছেন যাদের ভাগ্যে ক্ষুধা পিপাসা ছাড়া আর কিছুই জোটে না, অনেকে সারারাত ইবাদত যাপন করেন; কিন্তু তা রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই হয় না (মুসলিম)। আল্লহতায়ালা এ মাসে পবিত্র কোরআনুল কারীমের বিশেষ নিয়ামতে মানবতাকে ধন্য করেছেন, লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে সম্পূর্ণ কোরান একবারে এ মাসেই অবতীর্ণ হয়। তাছাড়া ইবরাহীম আ. এর ওপর সহিফাসমূহ, দাউদ আ. এর ওপর যাবুর ও মুসা আ. এর ওপর তাওরাত এবং ঈসা আ. এর ওপর ইনজিল এ মাসেই অবতীর্ণ হয়। শুধু সিয়াম সাধনাই এ মাসের শ্রেষ্ঠত্ব নয়; বরং এ মাসে পবিত্র কোরআন নাজিল হওয়ার কারণেই এ মাসের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই শুধু তেলাওয়াত নয় বরং কোরআনকে অর্থসহ বুঝে বুঝে অধ্যয়ন করা রমজানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কোরআনের বিধিবিধান জীবন ও সমাজে বাস্তবায়নই হবে রমজানের সবচেয় বড় শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, রমজান সেই মাস যে মাসে মানব জাতির পথ প্রদর্শনের নিদর্শনসমূহ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী কোরআন নাজিল হয়েছে। অতএব, যে এ মাস পেল সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে (সূরা বাকারা : ১৮৫)। মুুমিন বান্দাদের উচিত, এ মাসে সিয়াম সাধনার পাশাপাশি নেক কাজ বাড়িয়ে দেওয়া। জানা সব পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। অজানা পাপ থেকেও আল্লাহর কাছে কায়মনে আশ্রয় চাওয়া। হালাল রুজি ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। রমজান যেহেতু মানুষকে হারাম থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে, তাই এ মাসেই হালাল রুজিতে অভ্যস্থ হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। সিয়াম অনর্থক কাজ থেকে বিরত রাখে, জিহ্বায় লাগাম টানে, হৃদয় পরিচ্ছন্ন রাখে, ব্যবহারকে সুন্দর করে, হিংসা-রেষারেষি থেকে মুক্তিলাভের শিক্ষা দেয়। তাই বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত মানবতাকে অভিন্ন সুতায় বেঁধে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাতে হবে এ মাসে। অধিকার বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যও সোচ্চার হতে হবে সায়েমকে। আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর রঙ্গ ছড়িয়ে দেওয়ার দীপ্ত শপথ নিতে হবে এ মাসেই।   রমজানে পুণ্যের বদলে পাপ ও বক্রতা কোনো ব্যক্তির মধ্যে বেড়ে গেলে তা অবশ্যই আত্মিক পরাজয়, যার প্রভাব সমাজে পড়তে বাধ্য। রমজান শাসক-শাসিতে, ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নীচুদের মাঝে সেতুবন্ধনের একটি বড় মাধ্যম। অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বারণ করার এক বিরাট সুযোগ। রমজান সামাজিক, চিন্তাগত অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকার একটি উপলক্ষ। মুসলমানদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের সুবর্ণ সময় রমজান। তাই আমাদের উচিত রমজানে বেশি বেশি আত্মসমালোচনায় মনোযোগী হওয়া। তাকওয়া অর্জিত হলেই কেবল রোজা আমাদের পাপকে জ্বালিয়ে দেবে। শুধু তেলাওয়াত নয়, বরং কোরআনকে অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ পড়ে আমল করা জরুরি। এর মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারব আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী, আমরা কতটা মুত্তাকি হতে পেরেছি। বুঝতে পারব- রোজা আসে রোজা যায়, তবুও সমাজ থেকে পাপাচার, অন্যায়, পশুত্ব, রাহাজানি কেন দূর হয় না। তাই এ রমজান হোক নিজেকে বদলে দেওয়ার, পাপ-কালিমাকে মুছে দেওয়ার, আর আল্লাহর রহমত পাওয়ার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তোলার বিশেষ নিয়ামত। লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। www.selimazadi.com

এই লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে ছাপা হয়েছিল। দেখতে হলে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com