পারিবারিক সমস্যায় ধর্মীয় নির্দেশনা
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী |
রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ |
পড়া হয়েছে 80 বার
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার জন্য স্বামী ও স্ত্রীকে সমান ভূমিকা পালন করতে হয়। তবে শুরুটা যে কোনো একজনের পক্ষ থেকেই হয়। যেহেতু আমাদের দেশে সমমনা-সমসংস্কৃতির পরিবারের মধ্যে বিয়ের রেওয়াজ কমে যাচ্ছে তাই বিচ্ছেদের সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে যা করতে হবে, যে কোনো একজনকে উদ্যোগী হয়ে সংসারটা ঠেকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে। যিনি এ চেষ্টা-প্রচেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে সীমাহীন কল্যাণ ও উত্তম প্রতিদান দেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, একটি হাদিস মনে পড়ে গেল। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুই ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য যে ব্যক্তি চেষ্টা করে সে আল্লাহর পথে মুজাহিদের মতো মর্যাদাবান হিসেবে গণ্য হবে।’ অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদ মেটাতে যদি মিথ্যা কথাও বলতে হয় তাতে কোনো গুনাহ হবে না।’ হাদিস দুটি মিশকাতের কিতাবুল আদব থেকে নেওয়া। ভেবে দেখুন, যে নবী জীবনে কখনো মিথ্যা বলেননি, সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর মিথ্যা বলার অনুমতি দেওয়া থেকেই বোঝা যায় সম্পর্ক রক্ষা কোনো সহজ নেক আমল নয়। অন্যের সম্পর্ক জোড়া লাগানো বা ভাঙন ঠেকানোর তাৎপর্য যদি এত বেশি হয় তাহলে নিজের সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ, অন্যায় আচরণ সহ্য করার মর্যাদা আল্লাহর কাছে কত বেশি! সুবহানাল্লাহ। পারিবারিক বন্ধন টিকিয়ে রাখতে গেলে প্রতিটি সদস্যকেই কমবেশি আত্মত্যাগ করতে হয়। অন্যায় আচরণ সহ্য করতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারটি সবচেয়ে জটিল। দেখা যায়, একজন সেক্রিফাইস করছে তো অন্যজন আরও বেশি বেপরোয়া-ঔদ্ধত্য দেখিয়েই যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও কৌশলী হয়ে পা বাড়াতে হয়। সুরা নিসায় আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন তোমরা স্ত্রীর পক্ষ থেকে অবাধ্য আচরণ পাও তখন তাকে বোঝাও। প্রয়োজনে বিছানা আলাদা করে দাও। স্ত্রী যদি সংশোধন হয়ে যায় তাহলে তার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার কর। পুরনো দোষের কথা তুলে তাকে খোঁটা দিও না।’ আয়াত ৩৪। আয়াতটিতে যদিও স্ত্রীর বিষয়ে বলা হয়েছে তবে দাম্পত্য সমস্যা সমাধানে একই পদ্ধতি স্বামীর বেলায়ও প্রযোজ্য হবে বলে মত দিয়েছেন মুফাসসিররা। স্বামী যদি বারবার স্ত্রীর প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখায় এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রথম করণীয় হলো স্বামীর সঙ্গে মন খুলে আন্তরিকতার সঙ্গে সমাধানের আশায় আলোচনা করা। কেন সংসারের প্রতি তার অমনোযোগ তা আলোচনার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা। এ পদ্ধতিতে যদি কাজ না হয় তাহলে স্বামীকে বাস্তবসম্মত উদাহরণ দিয়ে বোঝানো। তাকে বলুন, তুমি এখন আর আগের মতো সাধারণ কোনো মানুষ নও। তুমি একজন পিতা অথবা পিতা হতে চলেছ। তোমাকে এখন অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এভাবে বোঝানোর পরও যদি কোনো কাজ না হয় তাহলে সংশোধনের নিয়তে বিছানা আলাদা করে ফেলুন। এভাবেই দাম্পত্য সমস্যা সমাধানে দরদি হয়ে স্বামী বা স্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথা আছে- মনুষ্য জাতি সময়ের কাজ সময়ে করে না, পরে পস্তায়। দাম্পত্য জীবনে যেন সমস্যা না আসে এ বিষয়ে আগে থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিটি সমস্যারই কারণ থাকে। তেমনি দাম্পত্য সমস্যারও কারণ রয়েছে। দাম্পত্য সমস্যার কমন একটি কারণ হলো স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে পর্যাপ্ত সময় দেয় না। প্রিয়জনের সঙ্গ মানুষের ফিতরাত তথা প্রকৃতি। সে প্রিয়জন যখন কাজের অজুহাতে বা অন্য কোনো কারণে সময় দিতে কার্পণ্য করে তখন একটা পর্যায়ে মানুষ প্রিয়জনকেই বদলে ফেলে। সোজা কথায় পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঠেকানোর বড় হাতিয়ার হলো একে অন্যকে যথার্থ সময় দেওয়া। মনে রাখবেন, যে প্রিয়জন আপনাকে সঙ্গ দেয় না এবং আপনার সঙ্গ চায় না এমন প্রিয়জন দিন শেষে আপনাকেই চায় না। তাই মন বিগড়ে যাওয়ার আগেই প্রিয়জনের মনের চাহিদার মূল্য দিন। সুন্দর সময় কাটানোর মাধ্যমে একে অন্যকে তৃপ্ত করুন। প্রতিদিনের বাঁধা জীবনে দাম্পত্য একসময় ফিকে হয়ে আসে। অথবা বলা যায়, দাম্পত্য নামক সোনালি ফ্রেমটায় ধুলো জমে। বুদ্ধিমান দম্পতিরা তখন সে ধুলো দূর করে ঘুরতে যাওয়ার মাধ্যমে কিংবা একত্রে খেলাধুলা অথবা চিত্তবিনোদন উপভোগ করে।লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি
www.selimazadi.com
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…
মন্তব্য...
comments