‘মা, তুমি ওষুধ খেয়ে নিও। আমি পৌঁছেই ফোন করব।’ আরেকটি মেয়েকে তার বান্ধবী বলেছিল—‘তুই তো বিয়ের পর আমাদের থেকে দূরে চলে যাবি।’ দূরে সে গেছে ঠিকই। কিন্তু এতটা দূরে যাবে—কেউ কি ভেবেছে কখনো? আত্মীয়স্বজন সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে স্বামীসহ সে চলে গেছে আমাদের পরম ঠিকানা শেষ মঞ্জিল আখেরাতে। হায়! এভাবেই বুঝি মানুষের ডাক এসে যায়। এভাবেই বুঝি মানুষের জীবন ঘড়ির সময় ফুরিয়ে যায়। জীবন ঘড়ির সময় যখন ফুরিয়ে যায় তখন আর এক সেকেন্ডও থাকার সুযোগ নেই এই দুনিয়ার রংমহলে। সে কথাই আবার দেখিয়ে দিল ইউএস-বাংলার দুর্ঘটনা কবলিত বিমানটি। ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত হওয়ার সেই ঘটনা এখনো শোকের চাদরে ঢেকে রেখেছে আমাদের। শোকের মাঝেও শিক্ষা থাকে। সে শিক্ষা সবাই দেখে না। দেখে শুধু তারাই, যাদের কপালের নিচে থাকা দুটো চোখ ছাড়াও কলবের কোঠরে আরও দুটো চোখ আছে। তেমনিই একজন কালব চোখের অধিকারী বিশিষ্ট ধর্মচিন্তাবিদ এবং সুফী ছড়াকার হাফেজ আহমাদ উল্লাহ। কাঠমান্ডুর বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি লিখেছেন—
‘নিমিশেই কেড়ে নিল/ শত জান-প্রাণ,/ইউএস বাংলার/অপয়া বিমান।
তোর সাথে করেছি রে/আমি অভিমান।/ শত শত প্রাণ নিয়ে/বিমান ওড়ে/অগত্যা লোকজন/বিমানে ঘুরে।/ হায়! হায়! হায়!/চিন থেকে চিনা প্রাণ/অচিনে হারায়।’ চেনা প্রাণ যখন অচিনে হারিয়ে যায় তখন হৃদয় নদীতে এভাবেই ঢেউ ওঠে। হায় হায় সুরে প্রিয়জনকে ডাকতে থাকে আপনজনরা। প্রিয়জন কি তখন আর শোনে আপনজনের হৃদয় নদীর হায় হায় কান্না? সে তো তখন চলে গেছে ইল্লিন কিংবা সিজ্জিনে। মহান মাবুদের কাছে। রঙের দুনিয়ায় সে যে আমল করেছে, তার প্রতিদান পেতে শুরু করেছে দুচোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গেই। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যখন কারও জীবন ঘড়ির ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে আসে, তখন ফেরেশতারা তার মাথার কাছে এসে বসে। সে যদি ভালো মানুষ হয়, তাহলে তাকে পরম সুন্দর মনোহর জান্নাত দেখিয়ে বলে, আল্লাহর বান্দা! ওই যে দেখ, কী চমৎকার জান্নাত। দুঃখ-কষ্টের এই স্বার্থের রংমহল ছেড়ে তুমি এখন থেকে ওই স্বর্ণখচিত প্রাসাদেই থাকবে। এখানে নেই কোনো কষ্ট-যন্ত্রণা। নেই দুঃখ-বেদনা। এ কথা শুনে মৃত্যু আসন্ন ব্যক্তিটির চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে। মুচকি হেসে বলে, আমি কখন যাব আমার সেই কাঙ্ক্ষিত জান্নাতে? কখন পাব আমার প্রেমময় প্রভুর দিদার? আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চল। এই বলে সে জান্নাতের দিকে তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকে। নবীজি (সা.) বলেছেন, দুনিয়ার মানুষ শোন! ওই তন্ময়তার মধ্যেই টুপ করে তার দেহ খাঁচা থেকে রুহ পাখিটি বেরিয়ে আসে। তখনকার অনুভূতি যদি জানতে চাও তবে ওই ঘুমন্ত শিশুর দিকে তাকাও যে মায়ের স্তন মুখে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। মা যখন স্তন ছাড়িয়ে নেয় তখন সে ঘুমের মাঝেই খানিক চমকে ওঠে। তেমনি যখন দেহ থেকে রুহ বেরিয়ে আসে তখন বিশ্বাসী আত্মা একটু চমকে আবার তন্ময় হয়ে জান্নাতের দৃশ্যের দিকে চেয়ে থাকে। ফেরেশতারা জান্নাতি আত্মাকে রেশমি রুমালে ঢেকে নিয়ে চলে যায় জান্নাতের রাজপ্রাসাদের উদ্দেশে।
নবীজি (সা.) আরেকটি মৃত্যুর চিত্র এঁকেছেন দুনিয়ার মানুষের সামনে। লোকটি যদি ভালো না হয়, আচার-ব্যবহার যদি নোংরা হয়, আমল যদি খারাপ থাকে তবে ফেরেশতারা তাকে জাহান্নামের লেলিহান আজাব দেখিয়ে বলে, এক জীবনে তুমি চাইলেই ভালো হতে পারতে হে আল্লাহর বান্দা। চাইলেই তুমি লোভহীন জীবনযাপন করে সুন্দর জান্নাতের মালিক হতে পারতে। তুমি খোদার কথা মাননি। তাই এখন থেকে তুমি ওই লেলিহান আজাবই ভোগ করবে। এ কথা শুনে লোকটি খুব ভয় পেয়ে যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, না। আমি যাব না। দেহ খাঁচা থেকে রুহ পাখিটি বেরুতে চায় না। একবার মাথায় একবার পায়ে, একবার পেটে, হাতে এভাবে সারা দেহে সে উড়তে থাকে আর ডানা ঝাপটে চিৎকার করতে থাকে—‘না, আমি যাব না’ বলে। তখন ফেরেশতারা দেহ খাঁচার প্রতিটি শিক মানে পশমের গোড়ায় হাত ঢুকিয়ে দেয়। রুহ পাখিকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনে। আহা সে কী ভীষণ কষ্ট। নবীজি (সা.) বলেছেন, পৃথিবীর মানুষ শোন! কোনো বকরিকে যদি জবাই না করেই তার হাত-পা বেঁধে দেহ থেকে চামড়া ছাড়ানো শুরু করে তবে ওই বকরিটির যত কষ্ট হবে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয় এই বদলোকটির রুহ বের হতে। যখন তার রুহ বের হয়ে যায় তখন একটি চটের কাপড়ে ঢেকে তা নিয়ে যাওয়া হয় অনন্ত আজাব জাহান্নামের দিকে। এতক্ষণ যে হাদিসটি বললাম তা ছিল মুসলিম শরিফের দীর্ঘ একটি হাদিসের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ। চেনা মুখ যখন অচিনে হারিয়ে যায় তখন স্বজন-প্রিয়জন কারও হায় হায় কান্না ওই অচিন দেশে পৌঁছায় না। রসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা যখন অচিন দেশে যাত্রা কর তখন তোমাদের অর্জিত তিনটি জিনিস বাকি থাকে। সম্পদ—যা তোমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ারিসদের নামে চলে যায়। স্বজন-প্রিয়জন, যারা তোমাকে কবর স্টেশনে পৌঁছে দেয়। আর তোমার আমল। এটিই তোমার ওই অনন্ত সফরের একমাত্র সঙ্গী। সুতরাং তোমাদের আমলগুলো সুন্দর কর। নবীজি (সা.) আরেকটি কথা বলেছেন, কেউ যখন মৃত্যুর দেশে পৌঁছে যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তার আপনজনরা যদি তার জন্য দোয়া করে তবে সওয়াব সে পাবে।
নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান ক্র্যাশে আমাদের যেসব চেনা মুখ অচিনে হারিয়ে গেছে, তাদের জন্য শোক না করে আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাদের অনন্ত সফর আখেরাতের জীবনকে সুন্দর করে দেন। একই সঙ্গে আমরাও যেন ওই জীবনের প্রস্তুতি নিতে পারি এই দুনিয়ায় বসেই। হে আল্লাহ! শোকগ্রস্ত পরিবারকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দিন। অচিনে হারিয়ে যাওয়া পাখিদের চিরসুন্দর নীড় জান্নাতে জায়গা করে দিন।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…..
