ভুলে গেছি নবীজির ধর্মীয় উদারতা

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | শুক্রবার, ২৯ জুলাই ২০২২ | পড়া হয়েছে 71 বার

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

 

নবম হিজরির কথা। কেবল মক্কা বিজয় হয়েছে। হুজুর (সা.) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

আশপাশের গোত্রগুলো থেকে আক্রমণের ভয় নেই। নিরাপত্তার প্রথম সুযোগেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে জোর দিলেন রসুল (সা.)। তৎকালীন সুপার পাওয়ার রোম ও পারস্যের রাজা থেকে শুরু করে মিসর, ইয়েমেন, ইথিওপিয়া প্রভৃতি রাজার কাছে একে একে চিঠি পাঠাতে লাগলেন। সব চিঠিতে একই দাওয়াত। আপনারা বহু ঈশ্বরের পূজা ছেড়ে এক আল্লাহর বন্দেগিতে শামিল হোন। কেউ দাওয়াত কবুল করল, কেউ করল না। তবে দিকে দিকে ইসলামের জয়গান ছড়িয়ে পড়ল। তৎকালীন ইয়েমেনের একটি বড় শহরের নাম ছিল নাজরান। এ অঞ্চলের সবাই গোঁড়া খ্রিস্টান। আসমানি কিতাবের এলেমে পারদর্শী। আখেরি নবীর আবির্ভাব নিয়ে তাদের মধ্যেও আগ্রহের সীমা ছিল না। রসুল (সা.) মুগিরা ইবনে শোবা (রা.)-কে দাওয়াতি চিঠিসহ নাজরানে পাঠালেন। তিনি স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করে চিঠিটিসহ ইসলামের দাওয়াত দিলেন। খ্রিস্টান আলেমরা মুগিরা (রা.)-কে কয়েকটি জটিল প্রশ্ন করলেন। তিনি সেগুলোর সদুত্তর দিতে না পেরে মদিনায় ফিরে গেলেন।

মুগিরা (রা.)-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ফলে নাজরানের খ্রিস্টান আলেমদের টনক নড়ল। যদিও তারা সব উত্তর পাননি, যতটুকু পেয়েছেন এতেই তারা বুঝতে পেরেছেন নবী দাবি করা মক্কার মুহাম্মদ যেনতেন লোক নন। তাঁকে বাজিয়ে দেখা দরকার। যদি সত্যিই নবী হন তাহলে ভেবে দেখা যাবে কী করা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ। ৬০ জন খ্রিস্টান আলেম ধর্ম সম্পর্কে বাহাসের জন্য মদিনায় এসে হাজির। তখন আসরের ওয়াক্ত। সাহাবিরা নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রসুল (সা.)ও ইমামতির অপেক্ষায়। এমন সময় নাজরানের মেহমানদের দেখে রসুল (সা.) হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। মসজিদের এক কোনায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করে হুজুর নামাজের ইমামতির জন্য উঠলেন। একজন খ্রিস্টান বলল, হে মুহাম্মদ! তোমরা নামাজ পড়বে। আমাদেরও তো ইবাদতের সময় হয়েছে। আমরা এখানেই ইবাদত করতে চাই। খ্রিস্টান পাদরির এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন সাহাবি তীব্র বাধা দিলেন। এ কেমন কথা! আল্লাহর ঘরে খ্রিস্টানদের ইবাদত? এ কোনোমতেই হতে পারে না। সাহাবিদের এসব বাদ-প্রতিবাদ শেষ হলে রসুল (সা.) শান্ত স্বরে বললেন, হে নাজরানের খ্রিস্টান বন্ধুরা! আপনারা আমার এ মসজিদেই ইবাদত করুন। এভাবে টানা কয়েক দিন মসজিদে নববিতে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা ইবাদত করতে লাগলেন। খ্রিস্টানদের কেবলা ছিল জেরুজালেম আর মুসলমানদের মক্কা। ফলে খ্রিস্টানরা ইবাদতের জন্য কাবা শরিফ পেছনে রেখে দাঁড়াত। 

পাঠক! এখানে একটু থামুন। ওপরের বলা ঘটনাটির সত্যতা যাছাই করে নিই আসুন। বাংলা ভাষায় মাওলানা আকরম খাঁ রচিত অনবদ্য সিরাতগ্রন্থ ‘মোস্তফা চরিত’-এর ৮৮১ পৃষ্ঠায় লেখক ঘটনাটি উল্লেখ করেন। এতে তিনি বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ মুজামুল বুলদান ও সিরাতগ্রন্থ জাদুল মাআদের রেফারেন্স দিয়েছেন। কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর অমর সিরাতগ্রন্থ ‘বিশ্বনবী’র ২৭৩ পৃষ্ঠায়, পাকিস্তানের বিখ্যাত নবী-গবেষক মাওলানা নইম সিদ্দিকি তাঁর ‘মুহসিনে ইনসানিয়াত’ -এর ৫০৯ পৃষ্ঠায়, মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি ‘সিরাতে মুস্তফা’র ৬২৬ পৃষ্ঠায় মাওয়াহেবে লদুনিয়ার রেফারেন্সে ঘটনাটি এনেছেন। সৈয়দ আমির আলীর ‘দ্য স্পিরিট অব ইসলাম’-এও ঘটনাটি পড়েছি তবে এখন খুঁজতে গিয়ে পেলাম না।

গোলাম মোস্তফা আসর নামাজের জায়গায় মাগরিবের উল্লেখ করেছেন। নইম সিদ্দিকি মসজিদে নববিতে খ্রিস্টানদের ইবাদতের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ইসলামে ধর্মীয় উদারতার দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে সৈয়ম আমির আলী সংক্ষেপে ঘটনাটি বলেন। মাওলানা আকরম খাঁ ও ইদরিস কান্ধলভির সিরাতে এ ঘটনাটি বিস্তারিত পাওয়া যাবে। খ্রিস্টান দলকে শুধু মসজিদে নববিতে থাকা বা ইবাদতের সুযোগ করে দিয়েই রসুল (সা.) ধর্মীয় উদারতার পরিচয় দেননি, তারা যখন দীর্ঘ বাহাস শেষে ইমান না এনেই নাজরানে ফিরে যাচ্ছিল তখন এক ঐতিহাসিক চুক্তি হয় তাদের সঙ্গে। সেখানে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যাপারে রসুল (সা.) ও সাহাবিরা প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করার কথা রয়েছে। তবে এজন্য খ্রিস্টানদের সামান্য কিছু কর মদিনায় পাঠানোর শর্ত দিয়েছেন হুজুর (সা.)।

পাঠক! ভাবুন তো, যে নবী ধর্মীয় ব্যাপারে এত উদার, মসজিদে নববিতে একদিকে নামাজ, অন্যদিকে ভিন্নধর্মের পূজা-অর্চনায় মগ্ন ৬০ জন খ্রিস্টান আলেম, সে নবীর উম্মত হয়ে আজ আমরা কী করছি? রসুল (সা.)-এর শান্ত নম্র ভদ্র কোমল ব্যবহারে কাফেরদের পাথরের মতো মনও গলে যেত। আর আমাদের কর্কশ রুক্ষ উগ্র আচরণে মুসলমানরাও ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। হায়! রসুলের জীবনী আমরা পড়ি না। কোরআন পড়ি না। তাই তো এমন উগ্রতার জাহিলিয়াত আমাদের ওপর জেঁকে বসেছে। হে আল্লাহ! আমাদের রক্ষা করুন।

 

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি  পীর সাহেব, আউলিয়ানগর।

www.selimazadi.com

 

লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com