এক নবীন মুরিদ পীরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা হুজুর! বলুন তো ব্যথা পেলে কেমন লাগে?’ পীর কোনো কথা না বলে হাতের লাঠি দিয়ে খুব জোরে মুরিদের মাথায় আঘাত করলেন। নবীন হলেও মুরিদের বুদ্ধি ছিল। মুচকি হেসে পীরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হুজুর! উত্তর পেয়েছি। আসলে ব্যথার অভিজ্ঞতা না হলে বলে ব্যথার যন্ত্রণা ব্যাখ্যা করা যায় না। তেমনি প্রেম না করলে প্রেমের স্বাদ বলে বা কবিতা লিখে যথার্থভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।’ জবাবে পীর বললেন, ‘বাবা! মাওলার প্রেমও এ রকম। বলে বোঝানো যায় না। উপলব্ধি করতে হয়। একবার যখন মাওলার প্রেমের উপলব্ধি হয়ে যাবে, মাওলার ইশকের স্বাদ পেয়ে যাবে তখন আনন্দের চেয়ে হৃদয়তীরে বেদনার ঢেউই বেশি আছড়ে পড়বে। তখন মনে হবে প্রেমিকের কাছে প্রেম ও বিরহ দুই-ই সমান। হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা সবই এক।’ নবীন মুরিদ হাঁ করে পীরের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা এসব সমান হয় কীভাবে, প্রশ্নটি মনে জেগেছে মাত্র। এখনো মুখ খুলে বলেনি। কলব জাগ্রত পীর কলবের খবর জানবেন এটাই স্বাভাবিক। মুরিদের মনের প্রশ্ন বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বললেন, ‘দেখ বাবা! এ জগতে পাগলের অভাব নেই। বলা যায় আমরা সবাই পাগল। কেউ টাকার পাগল, ক্যারিয়ারের পাগল, নারীর পাগল, পড়ার পাগল, আড্ডার পাগল… আবার মাওলার পাগলও আছে। একজন টাকার পাগলের কাছে টাকাই যেমন সব, তেমনি মাওলার পাগলের কাছেও মাওলাই সব। মানুষ যখন মাওলার পাগল হয়ে যায় তখন সে মনেপ্রাণে মাওলাকেই চায়। দুনিয়াদারি তার আর ভালো লাগে না। মাওলা তখন প্রেমের খেলা খেলেন। প্রেমিক চায় সর্বক্ষণ মাওলার প্রেমসাগরে ডুবে থাকতে। দুনিয়ার সব হিসাব-নিকাশ জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু মাওলার সান্নিধ্যে থাকার বাসনা যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, তখন আল্লাহ পর্দার আড়ালে চলে যান। দিদারে এলাহির পর্ব শেষ হয়ে দুনিয়ার বাহারি রং চোখে এসে ধরা দেয়। প্রেমিকের মন তখন হুহু করে ওঠে। তখনই প্রেমিকের কষ্টের মুহূর্ত শুরু। বুক ফাটা কান্নায় হৃদয়-মন সর্বক্ষণ ব্যাকুল থাকে। একই সঙ্গে প্রেমিকের অপেক্ষার আনন্দযাত্রাও শুরু হয়। আবার প্রভুর সান্নিধ্য পাওয়ার আনন্দ। আবার দিদারে এলাহিতে ডুবে যাওয়ার আনন্দ। এজন্যই বলেছি, মাওলার প্রেমিকের কাছে মিলন ও বিরহ, আনন্দ ও বেদনা দুটিই সমান।’
কিছুক্ষণ থেমে পীর বললেন, ‘এখন হয়তো তোমার মনে প্রশ্ন জেগেছে- দুটির মধ্যে কোনটির মাত্রা বেশি- আনন্দ না বেদনা? এ ক্ষেত্রে বেদনার মাত্রাই বেশি হবে। কেননা দুনিয়ার জীবনে চাইলেও বান্দা সর্বক্ষণ দিদারে এলাহিতে বুঁদ হয়ে থাকতে পারবে না। জীবনের তাগিদে তাকে প্রভুর মিলন থেকে অবসর নিতেই হবে।’ প্রেমিকের সান্নিধ্য পেয়ে বঞ্চিত হওয়ার আকুলতা সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে উঠেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কলমে। তিনি লিখেছেন, মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে তোমারে দেখিতে দেয় না।
তবে এ বিরহক্ষণ কারও কারও ক্ষেত্রে এত বেশি হয় যে হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে যায়। যেমন মাওলনা রুমি বলেন, ‘বাঁশঝাড় থেকে কেটে আনা বাঁশি বলে, যখন আমাকে আমার মূল বাঁশ থেকে আলাদা করে ফেলেছে, তখন থেকেই আমি বিরহ যন্ত্রণায় বুকফাটা আর্তনাদ করছি। আমার বিরহ কষ্ট দেখে সৃষ্টির সেরা মানুষ পর্যন্ত আফসোস করছে, কাঁদছে।’
মাওলনা রুমি বাঁশির আর্তনাদের উপমা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, খোদাপ্রেমীরা যখন খোদা থেকে জুদা হয়ে দুনিয়ায় এসেছে, তখনই তাদের হৃদয় বেদনার হাহাকার সুরে আর্তনাদ করে চলছে। দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে প্রেমিক যখন আবার মাওলার সান্নিধ্য অর্জন করে তখন সে হাহাকার কিছু সময়ের জন্য হয়তো বন্ধ থাকে, কিন্তু যখনই আবার প্রভু পর্দা টেনে দেন তখন হৃদয় বেকারার হয়ে পড়ে। টাকা পাগলের পাশে বসলে যেমন মানুষের মস্তিষ্কে টাকা অর্জনের বাসনা জেগে ওঠে, তেমনি আল্লাহ-পাগলের সান্নিধ্যে এলেও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আল্লাহকে পাওয়ার তামান্না প্রবলভাবে দুলে ওঠে। তখন সাধারণ মানুষও আল্লাহ আল্লাহ জিকিরে ডুবে যেতে চায়। আল্লাহ- ওয়ালাদের সঙ্গে মুনাজাতে ডুকরে কেঁদে ওঠে। পীর-মুরিদের বিরতিহীন দীর্ঘ কথাবার্তা থেমে গেল আসরের নামাজের আজান শুনে। পীর বললেন, ‘আজ আর নয়। চল নামাজে চল। মুমিনের জন্য প্রভুর প্রেমসাগরে ডুব দেওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো সালাত। এ সালাতের মাধ্যমেই আমরা হারিয়ে যাই দিদারে এলাহির আনন্দের ভুবনে। যদিও সে রকম সালাত সবার ভাগ্যে জোটে না। সে কথা আরেকদিন বলব।’
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি।