আল্লাহর রহমত ছাড়া এক মুহূর্তও বেঁচে থাকা, টিকে থাকা সম্ভব নয়। যদিও আমরা অনবরত বেরহমতের কাজই করে যাচ্ছি, তবুও তিনি রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করে যাচ্ছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, তিনি কত বড় মেহেরবান। আল্লাহর রহমত দুই ধরনের। এক ধরনের রহমত সবার জন্য নির্ধারিত। সবাই পায় সে রহমতের ভাগ। আরেক ধরনের রহমত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত। শুধু মাত্র বিশেষ বিশেষ আমল করতে পারলেই সে রহমতের ফোঁটা ভাগ্যে মিলবে। বিশেষ আমল করার মাধ্যমে যেমন বিশেষ রহমতের ভাগ পাওয়া যায়। তেমনি বিশেষ সময়ে প্রভুর ইবাদতের ডুবে থেকেও পাওয়া যায় রহমতের চাদরের নিচে একটুখানি জায়গা। আমাদের পেয়ারে নবী (সা.) বলে দিয়েছেন এমন কিছু বিশেষ আমল এবং বিশেষ সময়ের কথা। আসুন হাদিসের আয়নায় চোখ বুলিয়ে জেনে নিই রহমতের বৃষ্টিতে ভেজার সে আমল ও সময় সম্পর্কে।
হাদিস শরিফে এসেছে, রসুল (সা.) জোহরের ফরজ নামাজ পড়ার আগে চার রাকাত সুন্নাত নামাজ পড়তেন। এ নামাজকে তিনি এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে, কখনো যদি ব্যস্ততার কারণে এ চার রাকাত ছুটে যেত, তাহলে জোহরের ফরজ পড়ে তারপর সুন্নাত চার রাকাত পড়ে নিতেন। এ সম্পর্কে হুজুর (সা.) নিজেই একদিন বলেন, হে আমার উম্মত! শুনে রেখ, এটা খুবই দামি একটা মুহূর্ত। এ সময় আল্লাহতায়ালা আকাশের সবগুলো রহমতের দুয়ার খুলে দেন। আমি চাই, তখন যেন আমার আমলনামায় বেশি করে নেকি লেখা হয়। (তিরমিজি ও তাবারানি শরিফ)। এক ওয়াক্ত নামাজ শেষ করে আপনি যদি পরের ওয়াক্ত নামাজের অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে আপনার ওপর খুশি হয়ে আল্লাহতায়ালা আকাশ থেকে রহমতের ঝর্ণার একটি ফোয়ারা খুলে দেবেন। হ্যাঁ! এমনটিই বলেছেন পেয়ারা নবী (সা.)। একজন সাহাবি বর্ণনা করেছেন সে কথা। সাহাবি বলেন, একদিন আমরা মাগরিবের নামাজ পড়ে বসেছিলাম। একটু পর নবীজী উঠে গেলেন। যাদের প্রয়োজন ছিল তারাও বাড়ি চলে গেছেন। আমরা কজন মাত্র এশার নামাজের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অল্প সময় পর নবীজী আবার আমাদের কাছে এলেন। দেখে মনে হলো তিনি দৌড়ে এসেছেন। হাঁপাচ্ছিলেন খুব। তিনি বললেন, হে আমার সাহাবিরা! শুভ সংবাদ শুন। আল্লাহতায়ালা তোমাদের এ নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে দেখে খুব খুশি হয়েছেন। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে রহমতের একটি দুয়ার খুলে দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ ও মুজামুল কাবির) যখন কেউ কোরআন পাঠে মগ্ন থাকে, কোরআন বোঝার চেষ্টা করে, তখন কী কোরআন যার বাণী সেই প্রভু খুশি না হয়ে পারেন। খুশি হয়ে বান্দার জন্য খুলে দেন রহমতের সবগুলো দুয়ার। ক্ষমা করতে থাকেন বান্দার গোনাহ। বাড়তে থাকে মর্যাদা। নবীজী (সা.) বলেছেন, যখন তোমরা আল্লাহর কিতাব কোরআন নিয়ে আলোচনা কর, একজন আরেকজনকে বুঝিয়ে দাও, নিজে বুঝ কিংবা বুঝতে চাও, তখন তোমাদের ফেরেশতারা ঘিরে থাকে। আল্লাহর রহমতের চাদর তোমাদের ঢেকে রাখে। খুলে দেওয়া হয় আকাশের দরজাও। সুবহানাল্লাহ। (আবু দাউদ ও শুয়াবুল ইমান)। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত উসায়েদ (রা.) বলেন, একদিন রাতে আমি ঘরে কোরআন পড়ছিলাম। হঠাৎ শুনতে পাই আমার ঘোড়া বিচিত্র রকমের আওয়াজ করছে আর লাফালাফি করছে। বাইরে এসে দেখি, অদ্ভুত ধরনের তারকার মতো কী যেন ছেয়ে গেছে পুরো আকাশ। সকালে রসুল (সা.)-কে এ ঘটনা বলার পর তিনি বলেন, উসায়েদ! সেগুলো অদ্ভুত তারকা ছিল না। তারা ছিলেন আল্লাহর রহমতের ফেরেশতা। তোমার তেলাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে তারা এসেছিল। (সহি বুখারি)
একইভাবে কয়েকজন মানুষ বসে যদি আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকে, ধর্মীয় আলোচনা করে কিংবা ওয়াজ-নসিহত এবং মিলাদ-মাহলিফের আসর বসায়, তাহলেও ওই আসরকে রহমতের ফেরেশতারা ঘিরে থাকে। এবং তাদের সম্মানে আল্লাহতায়ালা আকাশের দুয়ার খুলে দেন। এতে করে জাকের-শাকেরদের দুনিয়া-আখেরাতের ভাগ্যের দুয়ারও খুলে যায় অনেক বেশি। এ সম্পর্কে একটি মজার হাদিস বলেছেন নবীজী (সা.)। তিনি বলেন, পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা ঘুরতে থাকে জিকির মজলিসে বসা লোকদের খোঁজার জন্য। যখনই তারা দেখে কোন আসরে বসে মানুষ আল্লাহর গুণগান করছে, সঙ্গে সঙ্গে তারা মজলিসটিকে ঘিরে বসে। ক্ষমা চাইতে থাকে আসরের প্রতিটি মানুষের জন্য। তখন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, বল তো ফেরেশতারা আমার বান্দারা কী করছে? ফেরেশতারা বলেন, তারা আপনার গুণগান করছে। আল্লাহতায়ালা আবার জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দারা কী আমাকে দেখেছে? আমার জান্নাত দেখেছে? ফেরেশতারা বলেন, তারা না আপনাকে দেখেছে, না আপনার জান্নাত দেখেছে। যদি তারা আপনাকে আর আপনার সৌন্দর্যে ঘেরা জান্নাত দেখত তবে তাদের আমল আরও বেড়ে যেত। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ঠিক আছে। আমি আমার এই বান্দাদের জন্য রহমতের দুয়ার খুলে দিলাম এবং তাদের নাম জান্নাতিদের খাতায় লিখে নিলাম। সুবহানাল্লাহ। (বুখারি ও শিকাত শরিফ)
আমরা কিছু আমলের কথা বলেছি, যেগুলো করলে রহমতের দুয়ার আল্লাহতায়ালা আমাদের জন্য খুলে দেবেন। আসুন! আমরা চেষ্টা করি, আল্লাহকে রাজি-খুশি করিয়ে আমাদের দুনিয়া-আখেরাতের ভাগ্যের চাকাটি রহমতের দুয়ারের দিকে ঘুড়িয়ে নেই।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি।
www.selimazadi.com
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…..
