রহমতের দিনগুলো ফুরিয়ে গেল মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | মঙ্গলবার, ০৬ জুন ২০১৭ | পড়া হয়েছে 611 বার

রমজানুল মোবারকের আজ ১০ম দিন। হজরত সালমান ফারসি বর্ণিত হাদিসে মহানবী সা. রমজান মাসের প্রথম ভাগে রহমত, মধ্য ভাগে মাগফিরাত ও শেষ ভাগে জাহান্নাম থেকে মুক্তি বলে ঘোষণা করেছেন।

সেই অনুযায়ী রহমতের ১০ দিন শেষ হয়ে গেল আজ। মহানবী সা. এ মাসের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, এটি সবরের মাস। আর সবরের প্রতিদান জান্নাত। সবর বা সহিষ্ণুতা মানবজীবনের একটি উন্নত গুণ। সবরের আভিধানিক অর্থ নিজেকে আবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানত তিনটিক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণকে সবর বলা হয়। ইবাদত করতে গিয়ে যে কষ্ট হয়, নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকতে যে কষ্ট হয় এবং বিপদের সময়ে যে কষ্ট হয়, তা সহ্য করার জন্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নাম সবর। আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন অনেক সময় প্রবৃত্তির চাহিদার খেলাপ হয়। তখন নিজেকে সংযত রেখে সঠিক নিয়মে সেই অদেশ পালন করা ঈমানের দাবি। যেমন ভোরে ঘুমের প্রাবল্য সত্ত্বেও বিছানা ছেড়ে ফজরের নামাজের জন্য উঠতে হয়। গভীর রাতের আরাম ত্যাগ করে যারা তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য ওঠেন, তাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত নাজিল হয়। এভাবে শরীয়তের যেসব নির্দেশ পালন করতে গিয়ে প্রবৃত্তির সঙ্গে বিরোধিতা করতে হয়, সেগুলোতে প্রমাণিত হয় ঈমানের দৃঢ়তা। নিষিদ্ধ কাজগুলো সাধারণত লোভনীয় হয়ে থাকে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, জান্নাতকে বেষ্টন করে আছে প্রতিকূলতা। আর জাহান্নামকে ঘিরে রেখেছে লোভনীয় বিষয়। অতএব নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকা আল্লাহ তায়ালার কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতিরই ফল। তেমনি বিপদের সময় অবিচলিত থাকা মুমিনের অন্যতম উন্নত আদর্শ। আল্লাহ তায়ালার হুকুম ছাড়া বিশ্বজগতে কিছুই ঘটে না। তারই ইচ্ছায় স্বাচ্ছন্দ ও সঙ্কট হয়। তিনি যখন ইচ্ছা করেন। এভাবে নিজেকে রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা ও হুকুমের কাছে সোপর্দ করা প্রকৃত ঈমানের দাবি। মহানবী সা. ইরশাদ করেন, জেনে রেখো, তুমি যা পেয়েছ তা তোমার থেকে এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না। আর তোমার থেকে যা এড়িয়ে গেছে, তা তোমার পাওয়ার ছিল না। অবশ্য সবরের আরো ক্ষেত্র রয়েছে। রাগের সময় সীমালঙ্ঘন না করা সবরের অন্তর্গত। মহানবী সা.ইরশাদ করেন, লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা বীরত্ব নয়, বরং রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করতে পারাই বীরত্ব। সমালোচনা সহ্য করাও সবর। নিন্দুক বা সমালোচক সত্যের আশ্রয় নেবে না এটাই স্বাভাবিক। তবুও অস্থির না হয়ে নিজ কর্তব্য ও আদর্শে স্থির থাকার শিক্ষা দেয় ইসলাম। মহানবী সা. ইরশাদ করেন, কটূকথা শুনেও সবরকারী আল্লাহর চেয়ে বড়। মোটকথা সবর একটি উন্নত মানবীয় গুণ, যা অর্জনের জন্য প্রতিটি ঈমানদারের চেষ্টা করা উচিত। মাহে রমজান সবরের গুণ অর্জনে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পানাহার বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের প্রবৃত্তি দমনের যে অভ্যাস গড়ে ওঠে, তা যখন অন্যসবক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়, তখন একজন মানুষের চরিত্র হয় উন্নত থেকে আরো উন্নত। নৈতিকতার উত্কর্ষ সাধনে মাহে রমজান এভাবেই প্রভাব ফেলে। সবরের মাহাত্ম্য ও প্রতিদান সম্পর্কে প্রচুর আয়াত ও হাদিস রয়েছে। যেমন সূরা বাকারার ১৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, হে মুমিনেরা, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। তেমনি সূরা জুমারের ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে-নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অভাবনীয় মাত্রায় দেওয়া হবে। আল্লামা মুনজিরি তার আত তারগিব ওয়াত তারহিব গ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে রা. বরাতে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। হজরত নবী করিম সা.ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত মানুষ আল্লাহর দরবারে হিসাব দেওয়ার জন্য হাজির হবে, তখন একজন ঘোষক বলতে থাকবেন, শ্রেষ্ঠ মানুষেরা কোথায়? তখন ছোট একটি দল উঠে দাঁড়াবে এবং দ্রম্নতগতিতে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। ফেরেশতারা এগিয়ে এসে তাদের জিজ্ঞেস করবেন, আপনারা এত দ্রম্নত জান্নাতে যাচ্ছেন আপনারা কারা? তারা বলবেন, আমরা শ্রেষ্ঠ মানুষ। প্রশ্ন করা হবে আপনাদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ কী? তারা বলবেন, আমাদের ওপর যখন অত্যাচার করা হতো, তখন আমরা ধৈর্য ধারণ করতাম। ফেরেশতারা বলবেন, যান আপনারা জান্নাতে চলে যান। আমলকারীদের কী উত্তম পুরস্কার। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের চরম পরিস্থিতির মুখে টিকে থাকতে হয়েছে। ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষায় তাদের উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। আল্লাহর রাসূল এই ক্ষুদ্র দলটিকে ঈমানের ওপর অটল রাখতে আগের যুগের নবীদের ও তাদের নিষ্ঠাবান অনুসারীদের ওপর বয়ে যাওয়া নিষ্ঠুরতার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে হজরত খাব্বাব রা. বর্ণনা রয়েছে যা প্রায় সব হাদিসের গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। তিনি বলেন, কাফেরদের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে আমরা আল্লাহর রাসূলের কাছে গেলে তিনি আমাদের বলেন, আগের যুগের নবীদের ও তাদের অনুসারীদের ওপর আরো কঠিন পরিস্থিতি এসেছিল। তবুও তারা অস্থির হননি। অথচ তোমরা অস্থির হয়ে পড়ছ। সেই কঠিন অবস্থায় তারা টিকে ছিলেন বলেই পরে ইসলামের প্রসার হয়েছে। আর সেই প্রথম যুগের এক একজন মুসলমান হয়েছেন মহাপুরুষ। তারা শুধু কাফেরদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিলেন না, পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। তবু ঈমান ও আমলে সালেহের ক্ষেত্রে তারা বিন্দুমাত্র শৈথিল্য দেখাননি। তাদের অবিচলতা ও দৃঢ়তা আমাদের অনুকরণীয়। তাদের সমকক্ষ না হতেও পারলে তাদের মতো হতে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যায় মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা। আল্লাহ আমাদেরকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত করুন। লেখক: বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। www.selimazadi.com

এই লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে ছাপা হয়েছিল। দেখতে হলে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com