শুদ্ধ করতে হবে নিজেকে
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী |
মঙ্গলবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২২ |
পড়া হয়েছে 101 বার
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
মানুষের ভিতর দুটি সত্তা রয়েছে। একটি পশু সত্তা। আরেকটি ফেরেশতা প্রকৃতি। পশুত্ব দমন করে ফেরেশতা প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টার মাধ্যমেই আদমসন্তান প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। মানুষ হওয়ার এ প্রক্রিয়াকে ইসলাম ধর্ম ‘তাসাউফ’ বা আত্মশুদ্ধি নাম দিয়েছে। ‘তাসাউফ’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘সাফা’ শব্দ থেকে। যার অর্থ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অকৃত্রিমতা বা নির্ভেজাল। মানুষের ভিতর-বাইরের পশুবৃত্তিকে মিটিয়ে দিয়ে ফেরেশতাবৃত্তি ফুটিয়ে তোলার নামই তাসাউফ। মূলত তাসাউফ চর্চার অভাবেই ব্যক্তির মধ্যে অপরাধ তথা গুনাহের চিন্তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সে ভয়ংকর অপরাধ করে ফেলে। এভাবে সমাজ ও দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন তাসাউফ- বিমুখ জীবনযাপন করে তখনই ওই সমাজ ও দেশ হয়ে ওঠে একটি নরককুন্ড, আজাবখানা। চারদিকে শুধু অশান্তি আর অশান্তি। এ অশান্তি আগুনের মতো পোড়াতে থাকে সমাজ ও দেশকে। মানুষে মানুষে সৎভাব, মায়া-মমতা, ভালোবাসা-সম্প্রীতি ও মনুষ্যত্বের চর্চার মাধ্যমে সমাজে, দেশে ও জনমনে শান্তির ঝরনাধারা প্রবাহিত করতে হলে অবশ্যই তাসাউফ চর্চা করতে হবে ব্যাপকভাবে। তাসাউফ চর্চা ছাড়া মানুষের আত্মায় শান্তির অমিয় ধারা বর্ষণের বিকল্প আর কোনো পথ নেই। তাই তো মানবসভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিটি আসমানি ধর্মে তাসাউফ চর্চা ছিল বাধ্যতামূলক। এখনো যতগুলো ধর্ম পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিটিই তাসাউফ তথা আত্মশুদ্ধির সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে কলবঘরের ওপরের দিকে। যার শেষ মনজিল স্রষ্টার সান্নিধ্য। আর স্রষ্টাতে লীন হওয়াই তাসাউফের একমাত্র উদ্দেশ্য। মানবাত্মা যখন পরমাত্মা হয়ে খোদার সঙ্গে মিশে যায়, লীন হয়ে যায়, ফানা হয়ে যায় তখনই মানুষের মধ্যে প্রকাশ হতে থাকে আল্লাহর সিফাত তথা গুণগুলো। দয়া-মায়া, প্রেম-ভালোবাসা, মমত্ববোধ- এসবই আল্লাহর সিফাত। তাসাউফ চর্চার মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে এসবের বিকাশ ও প্রকাশ ঘটতে থাকে।
তাসাউফ চর্চায় আমাদের উদাসীনতা আশঙ্কাজনক। আমরা যতটুকুই ধর্ম-কর্ম করি তাসাউফ চর্চা তার অনেক কম করি। তাই তো আমাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে কত ভয়াবহ বিপর্যয়। নৈতিক, চারিত্রিক, অর্থনৈতিক, মানসিক সব দিক থেকেই দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি আমরা। এর কারণ একটাই আমাদের মধ্যে তাসাউফ চর্চার অভাব। আবার যতটুকু চর্চা করছি তা-ও বিজ্ঞজনদের কাছে প্রশ্নমুক্ত নয়। আমাদের ধর্মে তাসাউফ চর্চা ফরজে আইনের অন্তর্ভুক্ত। ফরজে আইন মানে প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। কোনো অবস্থায়ই এর চর্চা থেকে নিজেকে বিরত রাখার সুযোগ নেই। বরং বিজ্ঞজনেরা তো বেশ জোরের সঙ্গেই বলেন, তাসাউফই ইসলাম ধর্মের প্রাণ। প্রখ্যাত মুফাসসির সানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.) তাফসিরে মাজহারিতে লেখেন, ‘সুফিরা যে শাস্ত্রকে ইলমে লাদুন্নি তথা তাসাউফ বলেন তা অর্জন করা ফরজে আইন। এর চর্চা মানুষের কলব থেকে আল্লাহ-ভিন্ন সব বস্তু ও ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে শুধু আল্লাহর প্রেম-ভালোবাসাই প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের মধ্যে প্রবৃত্তিগত যত দোষ আছে যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, লোভ, কাম, ক্রোধ, রিয়া এসব দূর করে দেয়। শুধু তাই নয়, মানুষের ভিতর সচ্চরিত্র, সত্যবাদিতা, মমত্ববোধ জাগিয়ে দেয় ইলমে তাসাউফ।’ ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, ‘ইলমে শরিয়ত অর্জন যেমন ফরজ, একইভাবে ইলমে তরিকত অর্জন করাও ফরজ। আর ইলমে তরিকত হলো তাওয়াক্কুল, খোদাভীতি, খোদার সন্তুষ্টি চর্চারই আরেক নাম।’ তালিমুল মুতাকাল্লিমিন।
লেখক : মুফাসসিরে কোরআন।
www.selimazadi.com
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…
মন্তব্য...
comments