
চোখের পলকে যেন চলে এলো সপ্তম রোজা। ইফতার শেষে পড়ব অষ্টম তারাবি। আহা! তারাবি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম অনুভূতি।
গভীর ভালো লাগা। স্নিগ্ধ প্রশান্তি। তারাবির নামাজ ফরজ নয়; কিন্তু রোজাদারের মন অতৃপ্ত থেকে যায় তারাবি না পড়া পর্যন্ত। কোনো কারণে তারাবির নামাজ ছুটে গেলে কেমন এক অস্বস্তির কাটা বিঁধে থাকে মুমিনের হৃদয়ে। কী যেন অপূর্ণ থেকে গেল। কী যেন হারিয়ে গেল— এভাবেই কেটে যায় রাত। পরের দিন আবার তারাবি না পড়া পর্যন্ত ছটফট করতে থাকে মুমিন হৃদয়। তারাবি বড় আনন্দের তেলাওয়াতের নামাজ। প্রেমের নামাজ। আরবি তারাবি শব্দের অর্থ বিশ্রাম। যেহেতু রমজানের পুরো রাত জায়নামাজে কাটনোই মুমিনের খেয়াল, তাই শরিয়তে তারাবির নামাজ প্রবর্তন করা হয়েছে। দুই রাকাত নামাজ, এক-আধ পারা কোরআন তেলাওয়াত, বিশ্রাম, আবার দুই রাকাত নামাজ, একটু বিশ্রাম— এভাবেই কাটানোর কথা রমজানের রাতগুলো। কিন্তু সবার পক্ষে এভাবে একাকী ইবাদতে মশগুল হওয়া সম্ভব নয় মনে করে ফকিহরা মসজিদে একত্রে তারাবি পড়ার নিয়ম করেছেন। সর্বপ্রথম হজরত ওমর (রা.) এ নিয়ম চালু করেন। তারপর থেকেই তারাবির জামাতের এই ধারা শুরু হয় মুসলিম দুনিয়ায়। শুরুর দিকে তারাবি পড়া হতো ধীরে-সুস্থে তারতিলের সঙ্গে। তারাবি পড়তে পড়তেই সাহরির সময় হয়ে যেত। আস্তে আস্তে অন্যান্য বিষয়ের মতো তারাবির প্রেম হারিয়ে গেল মুসলিম বিশ্ব থেকে। বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলমানদের থেকে। তারাবি হয়ে গেল তাড়াতাড়ির নামাজ। ১০ বছর আগেও তারাবিতে হাফেজ নিয়োগ হতো কে কত দ্রুত পড়তে পারে— এই যোগ্যতা দেখে। আল্লাহর মেহেরবানি এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা এখন অনেকটা কমে এসেছে। এখন মুসল্লিরাই বলেন, হুজুর কী পড়ান বুঝি না। এমনভাবে নামাজ পড়ান যেন আমরা সবাই বুঝতে পারি।
তবে দুঃখের কথা হলো, এখনো মহামারি কমেনি বরং বেড়েছে, তা হলো— রমজানের দুই-তিন মাস আগে থেকেই মানুষের ঝগড়া শুরু হয়ে যায় তারাবির রাকাত নিয়ে। আট রাকাত না বিশ রাকাত? এ ঝগড়া চলতে থাকে রোজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। সুফিরা বলেন, শয়তান যে কতভাবে ধোঁকা দেয় মানুষের পক্ষে তা বোঝা মুশকিল। শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো নেক সুরতে ধোঁকা দেয়া। এই অস্ত্র ব্যবহার করেই সে আল্লাহওয়ালাদের ধ্বংসের গর্তে ফেলে দিয়েছে। তো তারাবির রাকাত নিয়ে ঝগড়াও শয়তানেরই ধোঁকা। সে এই ঝগড়ার মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে অনৈক্য-বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছে। খুব ভালো করে খেয়াল করুন, তারাবি সুন্নাত নামাজ। আর ঐক্যবদ্ধ থাকা ফরজ। ‘ওয়াতাসিমু বিহাবলিল্লাহি জামিআ, ওয়ালা তাফাররাকু। তোমরা আল্লাহর রশি ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর। কখনোই দলাদলি করে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য করো না।’ তো দেখুন, সুন্নাত-নফল নিয়ে শয়তান কীভাবে আমাদের হারাম কাজে, কোরআনবিরোধী কাজে ডুবিয়ে রেখেছে। ব্যস! এ বিষয়ে এতটুকই বললাম। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন। কোরআন পড়ুন। আল্লাহ আমাদের মনে হেদায়াতের নূর ঢেলে দেবেন। তারাবি সুন্নাত নামাজ। আর সুন্নাত নামাজ কম-বেশি পড়া যায়। কোনো অসুবিধার কারণে পড়া না হলে তার জন্য কোনো গোনাহ হবে এমন একটি দুর্বল হাদিসও বর্ণিত হয়নি। তাই তারাবি পড়ব আমরা মন দিয়ে। প্রেম নিয়ে প্রেমিক হয়ে। গভীর আনন্দ এবং স্নিগ্ধ প্রশান্তির সঙ্গে। আপনি চাইলে তারাবি জামাতে পড়তে পারেন, একাকীও পড়তে পারেন। যেভাবেই পড়েন যেন তা প্রশান্তির নামাজ হয়। বিশ্বাস করুন, ঠুক-ঠাক ওঠা-বসার নামাজে আল্লাহ তো খুশি হন-ই না বরং রাগ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আপনি নিজেই ভাবুন না, আপনার কোনো খাদেম আপনার কাজ করতে এসে তিন ঘণ্টার কাজ দশ মিনিটে করে দিয়ে গেল, পুরো কাজে তাড়াহুড়োর চিহ্ন স্পষ্ট। কিছুই ঠিকমতো হয়নি। আপনি কি তার কাজে খুশি হবেন? আরেকজন খাদেম তার সাধ্য মতো দশ মিনিটই করেছে; কিন্তু তার কাজে বেশ গোছানো একটা ছাপ আছে। আপনি কার ওপর খুশি হবেন? বান্দা আমল বেশি করুক এটা আল্লাহরও উদ্দেশ্য নয়। তিনি চান বান্দা যেন সহি আমল করে, গোছানো আমল করে। সূরা মুলকে আল্লাহ বলেন, আহসানু আমালা। আমি দেখতে চাই, তোমাদের মধ্যে কে কত সুন্দর আমল করো। তিনি বলেননি, আকসারু আমালা— কে কত বেশি আমল করে সেটা আমি দেখতে চাই। রসুল (সা.) ও একই কথা বলেছেন, আখলিস দিনুকা ইয়াকফিকাল আমালুল কলিল। তোমরা দ্বীনকে খাঁটি করো। সুন্দর গোছানো করো। তাহলে স্বল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। আল্লাহ আমাদের দ্বীনের সহি বুঝ দিন।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, www.selimazadi.com
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…..
