
আরবি তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয়। যার মনে সব সময় আল্লাহতায়ালার ভয় কাজ করে, সে কখনো অন্যায়-অনিয়ম, মিথ্যা-দুর্নীতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। এমন বান্দাকেই কোরআনে প্রেমিক মুত্তাকি বলা হয়েছে। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বলেছেন, আত্তাকওয়া হা হুনা। তাকওয়া থাকে এখানে। এই বলে তিনি বুকের বা দিকে ইশারা করলেন। তাকওয়া থাকে প্রেমিক মনে। হৃদয়ের গহিন গভীরে। যেখানে কোনো বিজ্ঞানীর এক্সরে মেশিনও পৌঁছতে পারে না— সেখানে লালন করতে হয় তাকওয়া প্রেম। আফসোস! আমাদের তাকওয়া এখন শুধু পোশাকে-দাড়িতে-মেসওয়াকে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই আমরাও মেকি মুত্তাকি, মেকি মুসলমান হয়ে পড়েছি। হে আমার দরদি পাঠক! সিয়াম এসেছে আমাদের সত্যিকারের মুমিন, খাঁটি প্রেমিক মুত্তাকি বানাতে। ইবাদতের মধ্যে সিয়ামই এমন একটি ইবাদত যা পালন করতে বাহ্যিক কোনো সুরতের প্রয়োজন হয় না। নামাজ পড়ার জন্য আপনাকে মসজিদে যেতে হয়, একটি নির্দিষ্ট নিয়মে দাঁড়াতে হয়, ওঠাবসা করতে হয়, হজের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। জাকাত দিতে হলে অন্য মানুষ আপনার থেকে জাকাত নেবে। সে আপনার জাকাতের বিষয়টি জানবে, দেখবে। রোজাই একমাত্র ইবাদত, যা করতে অন্য কারো সাহায্য লাগে না, অন্য কেউ জানে না। মানে এখানে রিয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি সারাদিন যার সঙ্গে কাজ করেন, তাকে যদি মুখ ফুটে না বলেন তাহলে কিন্তু জানতেও পারবে না আপনি রোজাদার। তাহলে দেখা যাচ্ছে, রোজা একান্তই আপনার ইবাদত। আপনার আর আপনার প্রভু ছাড়া কেউ জানবে না আপনি রোজাদার। হ্যাঁ! কেউ যদি রোজা না রেখেও রোজার ভান করে বা বলে বেড়ায় আমি রোজাদার, আমি রোজাদার, সেটা ভিন্ন কথা। সে তো রোজার মানেই বুঝল না। এই যে আপনি একান্তভাবে রোজা রাখছেন, শুধু আপনার আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানার-দেখার সুযোগ রইল না; ঠিক এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন, ‘আদম সন্তানের সব আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। রোজার কথা ভিন্ন। রোজার প্রতিদান কত বাড়াবো কী দেব সেটা শুধু আমিই জানি। আসসওমু লি ওয়া আনা আজযি বিহি। বান্দা রোজা রাখে শুধু আমার জন্যই। কেননা, অন্য কোনো উদ্দেশে রোজা রাখার সুযোগ নেই। কেউই জানবে সে উপায়ও নেই। রোজা আমার জন্য। আমি নিজ হাতে এর প্রতিদান দেব। আরেকটি অনুবাদ হতে পারে এ রকম— রোজা আমার জন্য, আমিই রোজার পুরস্কার।’ বলা যায়, রোজা একটি খেলা মাত্র। প্রেমের খেলা। এ খেলায় যারা অংশগ্রহণ করেন, তারা কেউ চ্যাম্পিয়ন হন, আবার কেউ রানার্সআপ। যারা চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি, জীবনজুড়ে তাদের সাধনা করে যেতে হবে। আর যারা চ্যাম্পিয়ন হন, তাদের জুটে যায়, আল্লাহপ্রাপ্তি। কদরপ্রাপ্তি। তখন এক রাতের প্রেম-মিলন তাদের কাছে হাজার রাতের চেয়েও বেশি মধুর, বেশি দামি মনে হয়। সুফি গবেষক আহমাদ উল্লাহর গবেষণায় এভাবেই উঠে এসেছে সিয়াম সাধনার সারনির্যাস। তো পাঠক! আমাদের রোজাও যেন হয় আল্লাহপ্রাপ্তির রোজা। কদর পাওয়ার রোজা। আমরা যেন রোজা রেখে জাহান্নামি না হই। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কতক রোজাদার আছে, তাদের শুধু উপোস থাকা ছাড়া আর কোনো ফায়দা হয় না।’ আফসোস! তাদের জন্য, যারা সিয়ামের মতো মহাসমুদ্র থেকে একবিন্দুও অর্জন করতে পারেননি। আফসোস! যারা সিয়াম পেয়েও মানুষ থেকে মুমিন, মুমিন থেকে মুত্তাকি, মুত্তাকি থেকে সুফি-দরবেশ হয়ে আল্লাহওয়ালা হতে পারেননি। হে আল্লাহ! আমাদের সিয়ামকে সুফি হওয়ার মাধ্যম বানিয়ে দিন। এ সিয়াম যেন হয় আমাদের জন্য তোমাকে পাওয়ার, কদর পাওয়ার সিয়াম। হয় যেন প্রেমের খেলায়, আশেক মাশুকের খেলায় চ্যাম্পিয় হওয়ার সিয়াম। আমিন।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, www.selimazadi.com
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…..
