মুমিনের দিলের দুয়ারে কড়া নাড়ছে হজ। হজ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। তবে সব মুসলমানের ওপর হজ আবশ্যক নয়। আল্লাহ বলেন, ‘ওয়ালিল্লাহি আলান্নাসি হিজ্জুল বাইতি মানিস তাতাআ ইলাইহি সাবিলা। অর্থ, মানুষের মধ্য থেকে যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য আল্লাহর ঘরে হজ করা তাদের প্রভুর অধিকার। এ আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, হজ হলো সামর্থ্যবান মানুষের জন্য তার প্রভুর অধিকার। সামর্থ্য বলতে বোঝায়- ব্যক্তির দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে এমন অর্থ উদ্বৃত্ত থাকা যা দিয়ে সে হজের রাহা খরচ বহন করতে পারে। এটা হলো আর্থিক সামর্থ্য। একইভাবে ব্যক্তিকে শারীরিক দিক দিয়েও সক্ষম হতে হবে। শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলেই একজন মানুষের ওপর হজ ফরজ হয়।
আল্লাহর শোকর, এ বছর হজে যাওয়ার জন্য যারা বাইতুল্লাহর মুসাফিরের খাতায় নাম লিখিয়েছেন, তাদের সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১৪ জুলাই বাংলাদেশের প্রান্ত থেকে সোনার মক্কা-মদিনার উদ্দেশে হজের প্রথম ফ্লাইটটি উড়াল দেবে। আহা! কী সৌভাগ্য তাদের, যারা আল্লাহর ঘরের মেহমান হতে পেরেছেন। কী খোশ নসিব তাদের, যারা প্রিয় নবীর দেশের মুসাফির হিসেবে ঘর থেকে বের হয়েছেন। হাজীদের চোখে-মুখে এখন একটিই স্বপ্ন। একটিই আশা। কখন পাব মদিনার দেখা। কখন মক্কার অলিগলিতে হেঁটে বেড়াব। কোরআনের শহরে বসে দুই দণ্ড জিরিয়ে নেব তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে। বাইতুল্লাহর ছায়ায় নিজেকে মেলে ধরব কখন। এমন হাজারো সুন্দর স্বপ্ন আর কল্পনা ভেসে ওঠছে হাজীদের মনের আয়নায়। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই কাবাপ্রেমিক, নবীপ্রেমিক আল্লাহর বান্দারা বাইতুল্লাহর মুসাফির হয়েছেন, আল্লাহ যেন তাদের এ পবিত্র সফরকে কষ্টমুক্ত, হয়রানিমুক্ত করে দেন। এমনিতেই হজ একটি পরিশ্রমসাধ্য সফর। এর ওপর যদি পথের কষ্ট যোগ হয়, তবে তো দুর্ভাগ্যের শেষ নেই। বিশ্বের অন্য সব দেশের হাজীদের তুলনায় বাংলাদেশের হাজীদের ভাগ্য তেমন একটা ভালো নয়। দিন যতই বাড়ছে, হজ প্রক্রিয়া সহজ থেকে আরও সহজ হচ্ছে। পথের কষ্ট, হয়রানি দিন দিন কমে আসছে। শুধু আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের হাজীদের কষ্টই কেন যেন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরই একটা না একটা বিপর্যয় ঘটছেই। কখনো ফ্লাইট বিপর্যয়। কখনো ভিসা জটিলতা। আবার কখনো এজেন্সির সমস্যা। এক কথায় ঝামেলামুক্ত সুন্দর হজ এ দেশের মানুষের কপালে জুটেছে বলে শুনতে পাইনি, দেখতে পাইনি আজও। আগে এজেন্সিগুলো হাজীদের কষ্ট দিত। তাই হাজীদের সুবিধার জন্য অনলাইন সিস্টেমসহ আরও অনেক সুন্দর সুন্দর পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আফসোস! বিশ্বের অন্য সব হাজী এতে উপকৃত হলেও আমাদের দেশের হাজীদের বিড়ম্বনা আরও বেড়ে গেছে। এর অবশ্য কারণও আছে। অভিজ্ঞ লোকের অভাবে বারবার হজ বিপর্যয় ঘটে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, ভুল হয়ে গেলে তখন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু তাত্ক্ষণিক সুন্দর সমাধান দেওয়া তো সম্ভব নয়। হয়ও না। এভাবেই কোনোরকমে হজ শেষ করতে হয় বাইতুল্লাহর মুসাফিরদের। বিগত বছরগুলোতে হজ করেছেন, এমন মানুষের মুখে তাদের কষ্ট, যন্ত্রণা, আফসোস শুনেছি। চোখে তাদের বেদনার অশ্রু দেখেছি। কতজন তো বলেই ফেলেছেন, হুজুর! আল্লাহর মেহমানদের যারা এভাবে কষ্ট দেয়, তাদের যদি ক্ষমা না মিলে তাহলে তো সব শেষ। আমি নিজেই কত হাজীর চোখের পানি মুছে দিয়েছি। কত হাজীকে দেখেছি, মুখ লুকিয়ে, চোখ ঘুরিয়ে কান্না লুকিয়েছে। হায়! হজের মৌসুম এলে টিভি-পত্রিকা সব জায়গায় প্রধান শিরোনাম থাকে হজ বিপর্যয়। হাজীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে টিভির স্ক্রিন, পত্রিকার পাতা। ভাঙ্গিস স্ক্রিন কিংবা খবরের কাগজের কোনো অনুভূতি নেই। তাহলে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, হাজীদের যে সব বেদনাতুর খবর ছাপা হয়, এত করে খবরের কাগজ কিংবা স্ক্রিনের চোখ গলে অশ্রু ঝরত। আমরা আশা করি, এ বছর হাজীদের কান্নায় ভারী হবে না টিভির পর্দা, হবে না খবরের কাগজের শিরোনাম। বরং হাজীদের সুন্দর ব্যবস্থায় হেসে ওঠবে প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম। বাংলাদেশের আকাশ থেকে যখন মক্কা-মদিনার আকাশে উড়ে যাবে হাজীরা, তখন যেন আমাদের দেশ গর্ব করে বলতে পারে, হে মক্কা, হে সোনার মদিনা! বাংলা মায়ের কোল থেকে একঝাঁক হজ পাখি পাঠিয়ে দিলাম। যত্ন করে আগলে রেখ। হজ শেষে আবার আমার সন্তানদের আমার কোলে ফিরিয়ে দিও। হে হজ কর্তৃপক্ষ! আপনারা আল্লাহর মেহমানদের খাদেম। কত বড় মর্যাদা আপনাদের। দয়া করে কোনোভাবেই যেন হাজীদের কষ্ট না হয়- এ বিষয়ে সজাগ-সতর্ক থাকবেন। মহান আল্লাহ যেন হাজীদের যাত্রা শুভ করে দেন। সুন্দরভাবে হজ করিয়ে আবার আমাদের মাঝে তাদের ফিরিয়ে আনেন।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাসিসর সোসাইটি।
লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…..
