হে নেশাগ্রস্ত তরুণ! মাদক ছেড়ে দেওয়ার এখনই সময়

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী | শুক্রবার, ৩১ মার্চ ২০২৩ | পড়া হয়েছে 254 বার

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

একটি পরিবার, সমাজ, দেশ এমনকি গোটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয় মাদক। মাদকের কালো থাবায় মুহূর্তেই নিভে যায় তরুণ জীবনের রাঙা অরুণ। ঘোর অন্ধকার নেমে আসে কৈশোরের সোনালি সকালে। যে শিক্ষার্থী স্কুলে সবসময় প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি, সেই মেধাবী ছেলেটিই কলেজে ওঠে হঠাৎ ফেল করে বসে। আচরণেও খিটখিটে মেজাজের হয়ে পড়ে নিপাট ভদ্র বালকটি। বাবা-মা, ভাই-বোন কারও কোনো কথাই ভালো লাগে না তার। খোঁজ নিয়ে জানা যায় সে মাদকাসক্ত। খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কলিজার টুকরো সন্তানকে ভয়ঙ্কর নেশায় আসক্ত দেখে বাবা-মা অভিভাবকদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কত অভিভাক এসে বলেন, হুজুর! নীরবে-নিভৃতে বসে কাঁদি, কেন আমার সন্তান মাদকে জড়িয়ে গেল! আল্লাহ কেন এ পরীক্ষায় আমাকে ফেললেন! এসব বাবা-মায়ের চেহারার দিকে তাকানো যায় না। এদের একমাত্র আশা সন্তান যেন মাদকের অভিশপ্ত জীবন থেকে সুস্থ জীবনে ফিরে আসে। মাদকের ভয়াল থাবায় গুঁড়িয়ে যায় সোনার সংসারও। প্রতিবছরই বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে ঢাকাসহ জেলা শহরগুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় একটি সংসার ভাঙার আবেদন পড়ে। চট্টগ্রাম-বরিশালে এক ঘণ্টার কম সময়ে অর্থাৎ প্রতি ৪০ থেকে ৫০ মিনিটে একটি তালাকের আবেদন পড়ে। বেশিরভাগ আবেদনকারীই নারী। নারীরা কেন তালাকের আবেদনে এগিয়ে এ নিয়ে একটি গবেষণা করেন বাংলাদেশের গবেষকরা। আবেদনকারী নারীদের অর্ধেকের বেশিই জানিয়েছেন, স্বামীর মাদকাসক্তের কারণে সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। স্বামীর মাদকের টাকা জোগাতে হয়, টাকা না দিলে স্ত্রী-সন্তানকে মারধর করে, এসব অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অসহায় নারী মুক্তি খুঁজে নেয় বিবাহ বিচ্ছেদে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু পরিবার বা সমাজের বোঝা নয়, রাষ্ট্র এমনকি মানবতারও বোঝা। হে মাদকাসক্ত তরুণ! এ বোঝা থেকে নিজেকে সম্পদে রূপান্তরিত করার সেরা সময় মাহে রমজান বয়ে যায়। মাদকাসক্তদের বড় সমস্যা হলো ডিপ্রেশন বা হতাশা। হতাশা থেকে মুক্ত হওয়ার মহা ওষুধ হলো আল্লাহর সান্নিধ্য। বান্দা যখন নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, কোরআন তেলাওয়াত করে, ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করে তখন সে আল্লাহর কাছাকাছি চলে আসে। হৃদয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যের নূর উপলব্ধি করে। এ নূর যত বেশি গাঢ় হয় বান্দা ততবেশি হতাশামুক্ত আলোকিত পথে এগিয়ে যায়। আস্তে আস্তে নেশার অভ্যাস তো চলে যায়ই, ধীরে ধীরে দুনিয়ার মোহই তার ভিতর থেকে কেটে যায়। তখন দুনিয়ার লাভ-লোকসানে চেয়ে আখেরাতের লাভ-লোকসান তার কাছে বড় হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে সে বেলায়েতের এমন স্তরে পৌঁছে যায়, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি বিবেচনা করে ফেলা হয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা যখন ইবাদত করতে করতে আমার প্রিয় হয়ে যায়, তখন সে ফানাফিল্লাহর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যায়। তখন তার হাত আমার হাত হয়ে যায়। তার পা হয়ে যায় আমার পা। তার চোখ হয়ে যায় আমার চোখ। সে যা ধরে সেটা আমি ধরি। সে যে পথে হাঁটে সে পথে আসলে আমি হাঁটি। সে যা দেখে সেটা আসলে আমারই দেখা।’ (বুখারি)। বলছিলাম মাহে রমজান নেশামুক্ত জীবন গড়ার সোনালি সময়। এ সময় চারদিকে তাকওয়ার ফুল ফোটে। ঘরে-বাইরে, হাঁটে-বাজারে সবখানে তাকওয়াময় জিন্দেগির সুবাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। কেউ চাইলেই সে সুবাস কুড়িয়ে নিতে পারে। সব ধরনের নেশা বা মাদকের আড্ডা ছেড়ে দিয়ে খোদার রাহে নিজেকে সঁপে দিতে পারে। ইচ্ছা করলেই মাদকাসক্ত ব্যক্তি নামাজী ও রোজাদার হয়ে যেতে পারে। এভাবেই খোদার লাখো মুত্তাকি বান্দার ভিড়ে নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করার সবক পেয়ে যায় সে। রমজানের পবিত্র আবহ তার ভিতর জাগিয়ে দেয় খোদার পরিচয়। তাই তো সে ঘুম ছেড়ে, নেশার আসর ছেড়ে প্রেমময় রবের সান্নিধ্য পেতে রাত জাগরণে সহজেই নিজেকে যুক্ত করতে পারে। হে নেশাগ্রস্ত যুবক! ওঠ! দাঁড়াও! নিজেকে খোঁজ! প্রভুকে খোঁজ! মোরাকাবা-মোশাহাদায় একটু ডুব দাও। দেখ কী মজা! এভাবে এক দিন দুই দিন তিন দিন করতে করতে নিজেকে আবিষ্কার করবে প্রভুর প্রেমের শুরিখানার একজন পাগল দেওয়ানারূপে। তখন দুনিয়ার সব নেশা প্রভুর প্রেমের কাছে তুচ্ছ, ক্ষুদ্র অনর্থক মনে হবে তোমার। আল্লাহওয়ালা এক সুখ সাচ্ছন্দ্য জীবন পাবে তুমি। তোমার জন্য খোদার রাহে আমাদের অফুরন্ত দোয়া রইল। আমিন।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পীর সাহেব, আউলিয়ানগর,www.selimazadi.com

লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন…

মন্তব্য...

comments

কে. আর প্লাজা (১২ তলা) ৩১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
ফোন: ০২-৯৫১৫৬৪৬, মোবাইল: ০১৭১৮৭৭৮২৩৮, ০১৯৬৫৬১৮৯৪৭
ইমেইল- mawlanaselimhossainazadi1985@gmail.com
ওয়ের সাইট: selimazadi.com